সেই আনসাররা আজও পাননি যথার্থ স্বীকৃতি!
মেহেরপুর: মেহেরপুর মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে ১২ আনসার সদস্য গার্ড অব অনার দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে চারজন এখনও জীবিত আছেন। প্রথম সরকার গঠনের ৪৪ বছর পার হলেও আজও তাদের দেওয়া হয়নি যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
মাত্র দেড় হাজার টাকা ভাতা পান তারা। যে খাস জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তাদের নামে, তার ভোগ দখল পাননি আজও। ’৯৫ সালে একটি রুপার মেডেল পেয়েছিলেন। কিন্তু ওই মেডেল দিয়ে কী করবেন তারা! যেখানে তাদের অন্যের বাড়ি কাজ করে সংসার চালাতে হয়। তারা চান, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। বিশেষ মুক্তিযোদ্ধার সম্মান। বিশেষ ভাতা।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নেয় বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে। শপথ নেওয়ার পর সেই বৈদ্যনাথতলা হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক মুজিবনগর।
পুলিশ-ইপিআরের কেউ ভয়াবহ পরিণতির কথা চিন্তা করে রাজি না হলেও জীবনের মায়া ত্যাগ করে সেদিন শপথ অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের গার্ড অব অনার প্রদান করেন ১২ জন আনসার সদস্য। যাদের মধ্যে জীবিত চারজন আজও সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছেন।
তৎকালীন মেহেরপুরের পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে গার্ড অব অনার প্রদানকারী আনসার সদস্যরা হলেন-পিসি ইয়াদ আলী, সিরাজুল ইসলাম, অস্থির মল্লিক, হামিদুল ইসলাম, সাহেব আলী, লিয়াকত আলী, নজরুল ইসলাম, ফকির মোহাম্মদ, মহিউদ্দিন, কেসমত আলী, মফিজ উদ্দিন প্রমুখ।
আনসার সদস্য আজিম উদ্দীন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, “সেদিন মা-মাটি আর মানুষের মুক্তির কথা ভেবে জীবনের মায়া ত্যাগ করে মন্ত্রিপরিষদকে গার্ড অব অনার প্রদানে রাজি হয়েছিলাম। আমরা মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছি। কিন্তু আজ আমরা স্বাধীন দেশে অসহায়ের মতো জীবন-যাপন করছি।”
আনসার সদস্য (মৃত) মফিজ উদ্দিনের স্ত্রী সকিনা বেগম জানান, সংসারে এতোই অভাব ছিল যে, টাকার অভাবে নিজের বাড়ির জমির খাজনা না দিতে পারায় জমি খাস হয়ে যায়। ২ ছেলে ও ১ মেয়ে রেখে তিনি (স্বামী) ২০০৬ সালের ৪ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে বড় ছেলের ভ্যান চালানো আয়ের টাকা দিয়ে সংসার চলে। সেদিনকার ঘটনার জন্য তিনি ’৯৫ সালে পুরস্কার হিসেবে রুপার একটি মেডেল পান।”
সকিনা বেগম বলেন, “তার মৃত্যুর পর পরিবারের লোকজন একটি দুরুম বিশিষ্ট ঘর বুঝে পেয়েছেন। কাগজে-কলমে ৫০ শতক খাস জমি বরাদ্দ পেলেও দখল পাননি আজও।”
আনসার সদস্যরা জানান, মুজিবনগর কমপ্লেক্সের দক্ষিণ পাশের খাসজমিতে ১২ আনসার সদস্যকে জমি দেয় সরকার। তাদের মধ্যে জীবিত হামিদুল ও সিরাজ এবং মৃত ফকির, নজরুল, মফিজ উদ্দীন, সাহেব আলী ও মহিম উদ্দীনের পরিবার আজও সেই ঘর বুঝে পাননি। স্থানীয় এক প্রভাবশালীর সঙ্গে মালিকানার দ্বন্দ্ব থাকায় এ নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বুঝে পাইনি সে জমি।
আনসার সদস্য আজিমুদ্দিন শেখ বলেন, “তখন করেছি স্বাধীনতাযুদ্ধ আর এখন করছি জীবনযুদ্ধ। দিনমজুরের কাজ করি। শরীরে তেমন শক্তি নাই। অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রি করতে হয়।”
গার্ড অব অনার প্রদানকারী লিয়াকত আলী বলেন, “যে ভাতা পাই, তাতে সংসার চলে না। শরীরে নানা রোগের বাসা। গায়ে খেটে জীবন ধারণ করি। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমরা মাসে দেড় হাজার টাকা ভাতা পাই। এ টাকা দিয়ে কি এখন সংসার চলে?”
মুজিবনগর সরকারই দেশের প্রথম সরকার। এই সরকারের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে। তাই ইতিহাসের সাক্ষী এই আনসার সদস্যদের যথাযথ সম্মান দেওয়ার দাবি জানান মেহেরপুর সরকারি কলেজের অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল আমিন।
জাতির এই বীর সন্তানদের যথাযোগ্য সম্মান পাওয়া উচিত বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/কেজেএইচ
নিউজবাংলাদেশ.কম








