তেল নিয়ে ট্রাম্পের ঘোষণায় বিশ্ববাজারে বড় দরপতন
ছবি: সংগৃহীত
ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে মার্কিন হামলার সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) দিনের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যে এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দেয়।
মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ১০ দিনের জন্য হামলা স্থগিতের ঘোষণার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফেরায় বাজারের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে সম্ভাব্য হামলার সময়সীমা ১০ দিনের জন্য স্থগিত রাখা হবে, যা কার্যকর থাকবে আগামী ৬ এপ্রিল ২০২৬ রাত ৮টা পর্যন্ত।
ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দাবি করেন, ইরানি সরকারের অনুরোধ এবং চলমান আলোচনার অগ্রগতির কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও তেহরান এ ধরনের সরাসরি আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছে এবং মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদানকে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হিসেবে মানতে নারাজ।
বাজার তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ভোরে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ সেন্ট বা ০.৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১০৭.১১ ডলারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৮৩ সেন্ট বা ০.৮৮ শতাংশ কমে নেমে এসেছে ব্যারেলপ্রতি ৯৩.৬৫ ডলারে। অন্য এক হিসাব অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) রাত আড়াইটায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১.৫ শতাংশ কমে ৯৩.০৭ ডলারে এবং ডব্লিউটিআই ১.৮ শতাংশ কমে ১০৬.১২ ডলারে লেনদেন হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) তেলের বাজারে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা গিয়েছিল। শুক্রবারের এই পতন সেই উল্লম্ফনের কিছুটা কমালেও পুরোপুরি প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
আরও পড়ুন: দেশে এলো ৩০ হাজার টন জ্বালানি তেল
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত প্রত্যাশার তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এমন আশঙ্কা এখনও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়ে গেছে।
প্রসঙ্গত, ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআই প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও ইরান প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩৯ মিলিয়ন ডলার আয় করছে, যার বেশিরভাগই তেল রপ্তানি থেকে আসছে। বর্তমানে দেশটি দৈনিক গড়ে প্রায় ১০ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে বলে বাজার পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন।
এদিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরল গ্যাসবাহী জাহাজ চলাচলের প্রায় ২০ শতাংশ এই রুট ব্যবহার করে। অবরোধের কারণে অন্যান্য তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো বিকল্প পথ খুঁজতে গিয়ে চাপে পড়েছে, এমনকি উৎপাদন কমাতেও বাধ্য হচ্ছে। তবে ইরানের নিজস্ব ‘ইরানিয়ান লাইট’ তেল এই পথ দিয়েই নির্বিঘ্নে রপ্তানি হচ্ছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান নিয়েও বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একদিকে শান্তি আলোচনার কথা বলা হলেও, অন্যদিকে পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত ১০ হাজার সেনা মোতায়েনের বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে। এই দ্বৈত বার্তা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে এবং শেয়ারবাজারেও চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশ্বের বিভিন্ন শেয়ারবাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। ওয়াল স্ট্রিটে বড় ধরনের পতনের পর টোকিও ও সিউলসহ এশিয়ার কয়েকটি বাজারে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হংকং, সিডনি, জাকার্তা ও ম্যানিলাতেও তেলের দর নিম্নমুখী হয়েছে, যদিও সাংহাই ও সিঙ্গাপুরে ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা সতর্ক করেছে যে, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গত ৮০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলার মুখে পড়তে পারে। একইসঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, তেলের দাম বাড়তে থাকলে চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতি ৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে দ্রুত উত্তেজনা প্রশমিত হলে আগামী মাসগুলোতে দাম আরও কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








