সংঘাতের চাপে স্বর্ণের দরপতন, কমতে পারে দেশীয় বাজারেও
ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের ধস নেমেছে। সাধারণত বৈশ্বিক সংকটে স্বর্ণকে ‘নিরাপদ বিনিয়োগ’ (Safe Haven) হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ সুদের হারের আশঙ্কায় গত কয়েক দশকের মধ্যে স্বর্ণের বাজারে অন্যতম বড় সাপ্তাহিক পতন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
টানা ওঠানামার মধ্যে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) আবারও বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে, একই সঙ্গে কমেছে রুপা, প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দাম।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৬টা ০৫ মিনিটে স্পট গোল্ডের দাম প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৪২৬ দশমিক ৫০ ডলারে নেমে আসে, যা দিনে ১ দশমিক ৬ শতাংশ কম। অন্যদিকে রয়টার্সের তথ্য বলছে, একই দিনে স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৪৭৬ দশমিক ৫১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে এপ্রিল ডেলিভারির জন্য মার্কিন স্বর্ণের ফিউচার ২ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৪৫৭ ডলারে নেমে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে স্বর্ণবাজারে তীব্র অস্থিরতা বিরাজ করছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত স্বর্ণের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। জানুয়ারি ২০২৬-এ রেকর্ড ৫ হাজার ৫৯৫ ডলার স্পর্শ করার পর বর্তমান দাম অনেক নিচে অবস্থান করছে। বিশেষ করে গত সপ্তাহে ১০ শতাংশের বেশি পতন ঘটে, যা ১৯৮৩ সালের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক পতন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরস্পরবিরোধী অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। হোয়াইট হাউস যেখানে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনার কথা বলছে, সেখানে তেহরান মার্কিন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের শর্ত তুলে ধরেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, চার সপ্তাহের সংঘাত শেষ করতে ইরান একটি চুক্তির জন্য মরিয়া, যদিও ইরানের পক্ষ থেকে এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত জানানো হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট সতর্ক করে জানিয়েছেন, তেহরান যদি সামরিক পরাজয় মেনে না নেয়, তাহলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় আলোচনা-সংক্রান্ত অগ্রগতির ওপরই মূলত স্বর্ণবাজারের দিকনির্দেশনা নির্ভর করবে।
আরও পড়ুন: আবারও কমলো সোনার দাম
এদিকে, সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের উপরে উঠে গেছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে, কারণ এই পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।
সাধারণত ভূরাজনৈতিক সংকটে স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এবার চিত্র ভিন্ন। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির কারণে সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকতে পারে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। ফলে সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের আকর্ষণ কমে যাচ্ছে। সিএমই গ্রুপের ফেডওয়াচ টুল অনুযায়ী, চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাবে—এমন সম্ভাবনা এখন প্রায় নেই বললেই চলে, যদিও সংঘাত শুরুর আগে অন্তত দুই দফা হার কমানোর প্রত্যাশা ছিল।
স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য ধাতুর দামও নিম্নমুখী রয়েছে। স্পট সিলভারের দাম ১ দশমিক ৯ থেকে ২ শতাংশের বেশি কমে প্রতি আউন্স প্রায় ৬৯ দশমিক ৭০–৬৯ দশমিক ৯০ ডলারে নেমে এসেছে। প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ১ হাজার ৮৯৩ দশমিক ৬০ ডলার এবং প্যালাডিয়ামের দাম ২ শতাংশ কমে ১ হাজার ৩৯৪ দশমিক ৮৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ববাজারের এই পতনের প্রভাব দেশীয় বাজারেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে সাধারণত দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। ফলে যে কোনো সময় আবারও স্বর্ণের দাম কমানো হতে পারে।
বর্তমানে দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৫ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেট স্বর্ণ ২ লাখ ৩০ হাজার ৪৮১ টাকা, ১৮ ক্যারেট ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৩০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর আগে টানা ছয় দফায় স্বর্ণের দাম মোট ২৮ হাজার ৯৮৫ টাকা কমানো হয়েছিল।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক সুদের হার নীতির অনিশ্চয়তা—এই তিনটি বড় ফ্যাক্টরই এখন স্বর্ণবাজারের গতিপথ নির্ধারণ করছে। পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে আগামী দিনগুলোতে বাজারে আরও অস্থিরতা দেখা যেতে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








