News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১০:১৫, ২৬ মার্চ ২০২৬

৫৬তম স্বাধীনতা দিবস: মুক্তির চেতনায় আজকের বাংলাদেশ

৫৬তম স্বাধীনতা দিবস: মুক্তির চেতনায় আজকের বাংলাদেশ

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

ভোরের বাতাসে তখনো পুরোপুরি আলো ছড়ায়নি, চারদিকে এক গাম্ভীর্যপূর্ণ নীরবতা। যেন ইতিহাস নিজেই থমকে দাঁড়িয়ে আছে বিনম্র শ্রদ্ধায়। আজ ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল দিন, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দিন। রক্ত, বেদনা আর অদম্য সাহসের বিনিময়ে অর্জিত ৫৬তম এই স্বাধীনতা দিবসে আজ পুরো জাতি মেতেছে উৎসবে, একইসাথে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে ৩০ লাখ শহিদ ও নির্যাতিত মা-বোনদের। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে যে স্বাধিকার লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল, ১৯৭১ সালের এই দিনে তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।

একাত্তরের এই দিনটির পেছনে রয়েছে ২৫ মার্চের সেই কালরাত। ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ও পিলখানাসহ সারা দেশে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আধুনিক মরণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখনই রচিত হয় প্রতিরোধের মহাকাব্য। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে গ্রেপ্তার হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা দেন। ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সেই বার্তা পৌঁছে যায় দেশ-বিদেশে। এরপর চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শুরু হয় সেই অমোঘ ঘোষণার প্রচার। প্রথমে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হান্নান এবং পরবর্তীতে ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি) বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঘোষণা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার চূড়ান্ত প্রেরণা জোগায়।

স্বাধীনতার সেই ডাক শুনে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল। শুরু হয় দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। কারো হাতে ছিল অস্ত্র, কারো বুকে ছিল স্বাধীন দেশের স্বপ্ন। পাকিস্তানি বাহিনীর পাশপাশি তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর বর্বরতা ও গণহত্যার বিরুদ্ধে অদম্য সাহসে লড়াই চালিয়ে যায় বীর বাঙালি। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে উদয় হয় লাল-সবুজের স্বাধীন বাংলাদেশ। আজ ৫৬ বছর পরও সেই স্মৃতিসৌধের বেদিতে যখন ফুল পড়ে, তখন শুধু ফুল নয়, বরং লক্ষ প্রাণের আত্মদানের অঙ্গীকার পুনরায় উচ্চারিত হয়।

আরও পড়ুন: ৫৬তম মহান স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

দিবসটি উপলক্ষ্যে আজ বৃহস্পতিবার ভোরে রাজধানীসহ সারা দেশে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসের সূচনা হয়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর একে একে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, বিদেশি কূটনীতিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। জনমনে স্বস্তি ও উৎসবমুখর পরিবেশে এবার সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হচ্ছে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি, আধাসরকারি ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো সজ্জিত করা হয়েছে রঙিন পতাকায়।

মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার বাণীতে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর-উত্তমসহ সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠকদের অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। 

তিনি বলেন, স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি এবং মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি স্বনির্ভর ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। 
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে বলেন, স্বাধীনতা দিবস আমাদের সাহসিকতার প্রেরণা দেয়। একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য। সেই চেতনা হৃদয়ে ধারণ করে দেশের উন্নয়নকে আরও বেগবান করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।

দিবসটি উদযাপনে আজ সকাল ৯টায় জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সশস্ত্র বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ ও ফ্লাই পাস্ট অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা এবার সাধারণ মানুষের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এছাড়াও বিকেলে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও তার সহধর্মিণী ড. রেবেকা সুলতানা এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন। ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় সশস্ত্র বাহিনীর অর্কেস্ট্রা দল ও জনপ্রিয় ব্যান্ড 'ওয়ারফেজ'-এর পরিবেশনায় বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া সারা দেশের হাসপাতাল, জেলখানা ও এতিমখানায় উন্নত মানের খাবার পরিবেশন এবং সিনেমা হলগুলোতে বিনামূল্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

শহিদদের রক্তে রঞ্জিত সেই পথ বেয়ে আসা আজকের এই দিনটি প্রতিটি বাঙালির কাছে শুধু একটি ছুটির দিন নয়, বরং আগামীর উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার এক নতুন শপথের দিন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়