রানা প্লাজা দুর্ঘটনা: প্রধানমন্ত্রীর তহবিলের কোনো হিসাব নেই
ঢাকা: সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রান তহবিলে সংগৃহীত অর্থের পরিমান জানা নেই বলে জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মিকাঈল শিপার। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে “রানা প্লাজা দুর্ঘটনার দুই বছর পরে” শীর্ষক আলোচনায় তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এসব কথা বলেন। এতে দেশ বিদেশের বিভিন্ন সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। আলোচনার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান।
পরে ‘রানা প্লাজা দুর্ঘটনার দু’বছরের’ চতুর্থ পর্যবেক্ষণ গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকরা প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণের ৭০ শতাংশ পেলেও আহত, পঙ্গু ও চাকরি হারানো শ্রমিকরা রয়েছেন কষ্টকর জীবনে। ওই সময়ের অধিকাংশ শ্রমিকের জীবন যাত্রার মান নিন্মমানের হয়েছে। অনেকে এখনো কাজ করার অনুপযোগি।
মিকাঈল শিপার এর আগে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি রানা প্লাজা ঘটনায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের বর্ণনা করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রান তহবিল থেকে অর্থব্যয়ের কথা তুলে ধরেন। এসময় ঠিক কতো টাকা তহবিলে জামা হয়েছে বা তার পরিমান কত? এমন প্রশ্ন করেন সিপিডি সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর কোনো আলাদা তহবিল গঠন করা হয়নি। ওই সময় বিভিন্ন সংস্থা, ব্যক্তি পর্যায় থেকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রান তহবিলে সাধ্যপরিমান অর্থ জমা দিয়েছিলেন। এমনকি আমরা যারা সরকারি কর্মচারি তারাও দুই একদিনের বেতন দিয়েছিলাম। তবে আলাদা কোনো তহবিল না হওয়ায় এর অ্যামাউন্ড পাওয়া যায়নি।”
তবে ২০১৩ সালে জুলাই মাসে জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী জানিয়েছিলেন, “রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় প্রধানন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জামা পড়েছে ১২৭ কোটি ৬৭ লাখ ৩৩ হাজার ৩৪৯ টাকা।” এ তথ্য পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে শ্রম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। যাতে বলা হয়েছিল প্রধানন্ত্রীর তহবিল থেকে মোট অনুদান দেয়া হয়েছে ২২ কোটি ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭২০ টাকা।
এদিকে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে সংগৃহীত অর্থ বণ্টনে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থার মতে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২৭ কোটি টাকা হলেও এখনো অব্যবহৃত রয়েছে প্রায় ১০৮ কোটি টাকা। মঙ্গলবার রাজধানীতে সংস্থার নিজস্ব কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
রানা প্লাজার দুর্ঘটনার বিষয়ে টিআইবি প্রতিবেদনে বলা হয়, রানা প্লাজায় ডোনারস ট্রাস্ট ফান্ডে ক্রেতা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে প্রদানের পরিমাণ প্রায় ২.৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১২৭ কোটি টাকা)। এর মধ্যে অব্যবহৃত আছে প্রায় ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (১০৮ কোটি টাকা)।
ক্রেতাদের দেয়া অর্থে গঠিত ট্রাস্ট ফান্ড থেকে তিন হাজার ৬৬৩ জনকে ক্ষতিপূরণের অংশ হিসেবে অগ্রিম ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। বিকাশের মাধ্যমে এ টাকা দেয়া হয়েছে বলে ফান্ড কর্মকর্তা নৌশিন শফিনাজ সিপিডির অনুষ্ঠান শেষে নিউজবাংলাদেশকে জানিয়েছেন।
চতুর্থ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে সিপিডির গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “রানা প্লাজার দুই বছর পর এখনো ১৫৯ জন শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। এদের পরিবারের দেয়া তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাচাইয়ের কাজ বিগত এক বছরে তেমন অগ্রগতি লাভ করেনি। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিখোঁজদের পরিচয় ‘সুনিশ্চিৎ’ করে একটি তালিকা প্রকাশ করা দরকার। বাকীদের ক্ষেত্রে তাদের পরিবারের কাছে বাড়তি তথ্য চাওয়া যেতে পারে। নিখোঁজ হাবার কারণে এসব পরিবার তেমন কোনো সহায়াতা সহযোগীতা পাচ্ছে না।”
মোয়াজ্জেম বলেন, “রানা প্লাজার ঘটনায় নিখোজের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে ৩৬৫ নিখোজ শ্রমিকের মধ্যে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে ২০৬ জনের পরিচয় সনাক্ত করা হয়েছে। তারা কিছু সহায়তা পেলেও বাকী ১৫৯ শ্রমিকের পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে সব ধরনের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এসব শ্রমিকদের পরিবার।”
নিউজবাংলাদেশ.কম/জেএস/এএইচকে
নিউজবাংলাদেশ.কম








