News Bangladesh

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:৩৩, ৯ এপ্রিল ২০২৬
আপডেট: ১৪:৩৪, ৯ এপ্রিল ২০২৬

যুদ্ধবিরতির পর নতুন উত্তেজনা: হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন শর্ত

যুদ্ধবিরতির পর নতুন উত্তেজনা: হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন শর্ত

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিলেও কঠোর শর্ত ও টোল আরোপ করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইরান এখন এই প্রাকৃতিক জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি জাহাজের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি বা চীনা ইউয়ানে টোল দাবি করছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে আগাম অনুমতি নিতে বলছে এবং পেমেন্টের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি বা চীনা ইউয়ানের বিকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করলে হামলার ঝুঁকির সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

আইআরজিসির নির্দেশ অনুযায়ী, জাহাজগুলোর ক্রুদের ট্রানজিটের আগে অনুমোদন নিতে হবে এবং নির্দিষ্ট রুট ব্যবহার করতে হবে, যা কেশম ও লারাক দ্বীপের মধ্য দিয়ে ইরানের উপকূল ঘেঁষে। ‘বন্ধুসুলভ’ কার্গো দ্রুত পারাপার হলেও অন্য জাহাজ বিলম্ব বা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে। 

ফিনানসিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, তেলবোঝাই ট্যাংকারের ক্ষেত্রে ব্যারেলপ্রতি টোল এক ডলারের মতো হতে পারে, আর বড় সুপারট্যাংকারের ক্ষেত্রে এই খরচ কয়েক মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞার কারণে ডলারে লেনদেন করতে পারছে না। তাই ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ইউয়ানে লেনদেনকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এতে ট্র্যাক করা কঠিন এবং পশ্চিমা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা সহজ, যা প্রণালির ব্যবহার বাড়াতে সহায়ক। প্রণালিতে এই নিয়ম চালু হলে, আগে যেখানে দৈনিক প্রায় ১৩৫টি জাহাজ চলাচল করত, সেখানে সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

তবে যুদ্ধবিরতির আগে মাত্র কয়েকটি জাহাজ অনুমতি পাচ্ছে। হরমুজ প্রণালির দুপাশে প্রায় ৩০০-৪০০টি ট্যাংকার উপসাগরে অপেক্ষমাণ রয়েছে। শিপিং খাতের ভাষায়, পুরো এলাকা এখন ‘একটি পার্কিং লটে’ পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনে কৃত্রিম খালে টোল নেওয়া বৈধ হলেও, হরমুজের মতো প্রাকৃতিক জলপথে এটি বৈধ নয়। গালফের দেশগুলো এটিকে জাতিসংঘের সমুদ্র আইনের ‘নেভিগেশনের স্বাধীনতা’ নীতির লঙ্ঘন বলে দাবি করেছে।

আরও পড়ুন: যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল ইরান

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান যুদ্ধকালীন নিয়ন্ত্রণকে এখন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ারে পরিণত করেছে, সরাসরি সংঘাত ছাড়া বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব ফেলছে। গত মার্চের শুরুর দিকে, যুদ্ধ চলাকালে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করেছিল। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে, ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির খবর জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকরা আশা করেছিলেন, যুদ্ধবিরতির মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে জ্বালানি দামের উল্লম্ফন কমবে। তবে প্রণালি এখন ঠিক কতটা উন্মুক্ত তা স্পষ্ট নয়। ইরানঘেঁষা এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথের চলাচলকে ঘিরে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। যদিও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিকে সমর্থন জানিয়েছে, তবুও লেবাননে হামলা চালু রাখায় তেহরান হরমুজ প্রণালিকে বন্ধ রেখেছে। 

বিবিসি জানিয়েছে, দুটি ইরানি সংবাদমাধ্যম জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট থেকে তথ্য উল্লেখ করেছে, যেখানে দেখা গেছে পানামার পতাকাবাহী একটি জাহাজ প্রণালির কাছাকাছি এসে ফিরে গেছে।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট সাংবাদিকদের বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার খবর ‘সঠিক নয়’ এবং জাহাজ চলাচলের সংখ্যা ‘বাড়ছে’। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে অবগত আছেন এবং মার্কিন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, প্রণালি আসলে খোলা আছে।

বাণিজ্যিক জাহাজ বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এসএসওয়াই জানিয়েছে, উপসাগরে অবস্থানরত জাহাজগুলো আইআরজিসি থেকে বার্তা পেয়েছে, যা বলছে: অনুমতি ছাড়া প্রণালিতে প্রবেশ করলে জাহাজ ধ্বংস করা হবে। এ ছাড়া, এ পথে চলাচলের জন্য নতুন ও বিকল্প রুটও ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে মাইন এড়িয়ে নিরাপদে চলাচল সম্ভব হয়।

দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে, তেহরান হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ সমুদ্রপথে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। 

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সমুদ্র নিরাপত্তার নীতিমালা মেনে বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হবে এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পরবর্তী ধাপ পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হবে। তখন হরমুজ প্রণালির চলাচল ও নিরাপত্তা বিষয়ক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়