জাতির পিতার পরিবারের বিশেষ নিরাপত্তা আইন বাতিলসহ ১৩ বিল পাস
ফাইল ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১১তম দিনে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক আইনগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মোট ১৩টি বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে ‘জাতির পিতার পরিবার-সদস্যগণের নিরাপত্তা আইন, ২০০৯’ রহিত করে বিল পাস করা হয়েছে। যার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত বিশেষ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, আজীবন রাষ্ট্রীয় বাসভবন ও অন্যান্য সকল বিশেষ সুবিধাদি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হলো।
বুধবার (০৮ এপ্রিল) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিলগুলো কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিভিন্ন বিল উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা।
নিরাপত্তা আইন বাতিল: বৈষম্য দূর করার যুক্তি
রহিতকরণ বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়, ২০০৯ সালের ১৫ অক্টোবর জারি হওয়া আইনটির মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট পরিবারের সদস্যদের জন্য বিশেষ রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বৈষম্যমূলক হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০১৫ সালের ২৫ মে এ আইনের আওতায় বিশেষ নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার এই বৈষম্য দূর করতে আইনটি বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ‘জাতির পিতার পরিবার-সদস্যগণের নিরাপত্তা (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ জারি করা হয়। সেই অধ্যাদেশটিকেই এখন স্থায়ী আইনে রূপ দেওয়া হয়েছে।
এই আইন বাতিলের ফলে বঙ্গবন্ধুর জীবিত দুই কন্যা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য আজীবন বিশেষ নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় বাসভবনসহ অন্যান্য সুবিধা প্রদানের বিধান বিলুপ্ত হলো।
এসএসএফ আইনের সংশোধন
একই দিনে ‘বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ পাস করা হয়। এতে পূর্বের আইনে থাকা বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা প্রদানের বিধানগুলো বাতিল করা হয়েছে। সংশোধনের মাধ্যমে ২০২১ সালের আইনের কয়েকটি ধারা থেকে সংশ্লিষ্ট অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নতুন বিধান
সংসদে পাস হওয়া ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সত্তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে তাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। আগে আইনে শুধু তালিকাভুক্ত করার সুযোগ থাকলেও এখন সরাসরি কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ-২০২৬’ বিল পাস
নতুন আইনে বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত সত্তার পক্ষে বা সমর্থনে যেকোনো প্রচারণা, বিবৃতি, সভা-সমাবেশ, মিছিল কিংবা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে।
এই সংশোধনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সংশ্লিষ্ট নেতাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে দলটির নিবন্ধন স্থগিত থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়।
বিরোধীদলের আপত্তি ও স্পিকারের অবস্থান
সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধনী বিল পাসের সময় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বিলটি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেন, তারা প্রয়োজনীয় তুলনামূলক নথি দেরিতে পেয়েছেন এবং বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় আরও সময় দেওয়া উচিত ছিল।
তবে স্পিকার জানান, আপত্তি জানানোর নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ায় ওই পর্যায়ে আর আপত্তি গ্রহণের সুযোগ নেই। পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) আইন, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহারের বিধান রাখা হয়েছে। নতুন করে এ ধরনের মামলা দায়েরও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তবে কোনো হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে তা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে তদন্তের জন্য দাখিল করা যাবে। তদন্তে অপরাধমূলক অপব্যবহার প্রমাণিত হলে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের বিধান রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক প্রতিরোধ হিসেবে বিবেচিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অন্যান্য পাস হওয়া বিল
এদিন আরও যেসব বিল পাস হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সরকারি হিসাব নিরীক্ষা আইন, ২০২৬’, ‘প্রোটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’, ‘শেখ হাসিনা পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, জামালপুর (সংশোধন) আইন, ২০২৬’, ‘পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (রহিতকরণ) আইন, ২০২৬’, ‘স্থানিক পরিকল্পনা আইন, ২০২৬’, ‘পরিত্যক্ত বাড়ি (সম্পূরক বিধানাবলি) আইন, ২০২৬’ এবং ‘কোড অব সিভিল প্রসিডিউর (সংশোধন) আইন, ২০২৬’।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার একাধিক অধ্যাদেশ জারি করে বিভিন্ন আইন সংশোধন ও রহিত করার উদ্যোগ নেয়। জাতীয় সংসদে পাস হওয়া এসব বিলের মাধ্যমে সেই অধ্যাদেশগুলোকে স্থায়ী আইনে রূপ দেওয়া হলো।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








