ইসরায়েলের বিমান হামলায় লেবাননে একদিনে নিহত ২৫৪
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে লেবাননজুড়ে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
বুধবার (০৮ এপ্রিল) বিকেল থেকে শুরু হওয়া এই নজিরবিহীন তণ্ডবলীলয় মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে লেবাননের অন্তত ১০০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী। যার ফলে একদিনেই কমপক্ষে ২৫৪ জন নিহত এবং ১,১৬৫ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
লেবাননের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, রাজধানী বৈরুতসহ বিভিন্ন এলাকায় আক্রমণ চালানো হয়েছে, যার মধ্যে বেসামরিক এলাকা ও আবাসিক ভবনও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। বৈরুতের আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢাকা পড়েছে, হাসপাতালগুলো আহতদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, এবং পর্যাপ্ত রক্ত ও অ্যাম্বুলেন্সের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, হামলার মধ্যে ছিল হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টার, সামরিক স্থাপনা, এবং বৈরুতের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। লেবাননের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাকান নাসেরুদ্দিন এই পরিস্থিতিকে ‘বিপজ্জনক উস্কানি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিকতার তোয়াক্কা না করে নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
সিভিল ডিফেন্সের হিসাব অনুযায়ী, বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে ৬১ জন নিহত এবং ২০০ জন আহত হয়েছেন। নাবাতিয়েহে নিহত ২৮, আহত ৫৯; বালবেকে নিহত ১৮, আহত ২৮; আলেই জেলায় নিহত ১৭, আহত ৬; টায়রে নিহত ১৭, আহত ৬৮; সিদনে নিহত ১২, আহত ৫৬; হেরমেলে নিহত ৯, আহত ৬ জন। বৈরুতের মোট নিহত ৯১ জন এবং আহত ৭৪২ জন।
আরও পড়ুন: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে লেবাননে ব্যাপক হামলা ইসরায়েলের
হিজবুল্লাহ বৃহস্পতিবার ভোরে উত্তর ইসরায়েলের একটি এলাকায় রকেট হামলা চালিয়েছে। তারা জানিয়েছে, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় এই প্রতিক্রিয়া নেওয়া হয়েছে এবং এই জবাব অব্যাহত থাকবে যতক্ষণ না তাদের দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি-আমেরিকান আগ্রাসন বন্ধ হয়।
হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম আল-মুসাউই জানিয়েছেন, তাদের জানানো হয়েছিল যে যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননও রয়েছে, কিন্তু ইসরায়েল তা লঙ্ঘন করেছে।
এ হামলা সংঘটিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে।
তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, লেবানন এই চুক্তির অংশ নয়। হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব এবং ভাইস প্রেসিডেন্টও নিশ্চিত করেছেন যে লেবাননকে যুদ্ধবিরতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
ইসরায়েলের সেনাপ্রধান ইয়েল জামির জানিয়েছেন, কোনো আপস ছাড়াই হিজবুল্লাহর ওপর হামলা অব্যাহত থাকবে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, লেবানন যুদ্ধবিরতির আওতায় নেই এবং সেখানে সামরিক অভিযান চলবে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক এ হামলার মাত্রা ‘ভয়াবহ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। লেবাননের প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মহলের কাছে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন এবং জাতিসংঘের বিশেষ সমন্বয়কারী জিনাইন হেনিসও অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই হামলার পর লেবাননের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। চলমান সংঘাতের এই দফায় ২ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত লেবাননে ১,৫৩০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ১২ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধবিরতির আওতায় না থাকা লেবাননে এমন বিধ্বংসী হামলা মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা বৃদ্ধি করছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, টিআরটি ওয়ার্ল্ড ও স্থানীয় সংবাদ সংস্থা
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








