মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি: একনজরে ৪০ দিনের লড়াই ও প্রাণহানি
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ ৪০ দিনের ভয়াবহ সংঘাত ও চরম উত্তজনা শেষে অবশেষে শান্ত হতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান দুই সপ্তাহের জন্য একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।
বুধবার (০৮ এপ্রিল) সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নির্দিষ্ট সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টা আগে এই নাটকীয় সমঝোতা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমাতে পাকিস্তানের বিশেষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। তেহরান জানিয়েছে, এই চুক্তির ফলে এখন থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় নিরাপদে জাহাজ চলাচল করতে পারবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরানে হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। ইরানও বসে থাকেনি; তারা ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা প্রতিশোধমূলক আক্রমণ চালায়। এই প্রাণঘাতী সংঘাত দ্রুতই পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নেয়। আজ ৪০তম দিনে এসে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও গত কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন দেশে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।
- ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র: পর্যালোচনায় বিভিন্ন দেশ
যুদ্ধ চলাকালীন প্রাণহানির যে পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ-র তথ্যমতে, ইরানে মোট ৩ হাজার ৬৩৬ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৭০১ জন বেসামরিক নাগরিক এবং অন্তত ২৫৪ জন শিশু রয়েছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, ইরানে নিহতের সংখ্যা অন্তত ১ হাজার ৯০০ এবং আহত হয়েছেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। এছাড়াও গত ৪ মার্চ শ্রীলঙ্কা উপকূলে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজে মার্কিন হামলায় আরও ১০৪ জন সেনার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।
লেবাননেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ৫৩০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১২৯ জন শিশু। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে ৪০০-এর বেশি যোদ্ধা নিহতের দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া দক্ষিণ লেবাননে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ইন্দোনেশিয়ার ৩ জন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী প্রাণ হারিয়েছেন। ইসরায়েলি হামলায় লেবানন সেনাবাহিনীর ১০ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক ও চিকিৎসাকর্মীও নিহত হয়েছেন।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধবিরতি পর তেলের দাম কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ
- আক্রান্ত অন্যান্য দেশ ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতি
ইরাক ও সিরিয়াতেও যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল।
ইরাকি স্বাস্থ্য বিভাগের মতে, দেশটিতে অন্তত ১১৭ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ছাড়াও শিয়া পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস, কুর্দি পেশমার্গা এবং পুলিশ-সেনাবাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন। সিরিয়ার সুয়েইদা শহরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি ভবনের ৪ জন নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সানা।
সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত থাকা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও হতাহতের শিকার হয়েছে।
ইসরায়েলের অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা জানিয়েছে, ইরান ও লেবানন থেকে ছোড়া মিসাইলে দেশটিতে ২৩ জন নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ লেবাননে সম্মুখ যুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ১১ জন সেনা নিহত হয়েছেন।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্যমতে, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ জন সেনাসদস্য নিহত এবং ৩০০-এর বেশি আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ইরাকে একটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৬ জন এবং সরাসরি অভিযানে ৭ জন নিহত হন। এছাড়া উত্তর ইরাকে ড্রোন হামলায় ফ্রান্সের একজন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।
- মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলের পরিস্থিতি
সংযুক্ত আরব আমিরাতে দুই সেনাসহ মোট ১৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে আবুধাবির হাবশান গ্যাসক্ষেত্রে। কাতারে ২২ মার্চ নিয়মিত দায়িত্ব পালনের সময় কারিগরি ত্রুটির কারণে একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ৪ জন কাতারি সেনা, ১ জন তুর্কি সেনা এবং ২ জন তুর্কি প্রযুক্তিবিদসহ মোট ৭ জন নিহত হন।
কুয়েত ও বাহরাইনেও নিহতের খবর পাওয়া গেছে যথাক্রমে ৭ জন ও ২ জন। ওমান ও সৌদি আরবেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ৪ জন ফিলিস্তিনি নারী নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
- প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবস্থা
মধ্যপ্রাচ্যের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ বাড়ছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়েও।
বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ৩ এপ্রিলের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, চলমান এই যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত অন্তত ৬ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন।
বর্তমানে দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর অবরুদ্ধ এলাকাগুলোতে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানো এবং পরিস্থিতি পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই বিরতি দীর্ঘমেয়াদী শান্তিতে রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে এখনো শঙ্কা কাটেনি।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এইচআরএএনএ ও সংশ্লিষ্ট দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








