৫৬ জেলায় হামের বিস্তার, আরও ৪ শিশুর মৃত্যু
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়েছে অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৬টিতেই এই সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। গত দুই বছরে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন ঘটায় শিশুদের মধ্যে তৈরি হওয়া ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতিকে এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে প্রাণহানি ৫০ ছাড়িয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার (০২ এপ্রিল) সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয় থেকে পাঠানো বিবৃতি ও পরবর্তীতে গণমাধ্যমকে সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি তৈরি হওয়া যাকে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বলা হচ্ছে এই প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ। কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন, অসম টিকাদান হার এবং নির্ধারিত ডোজ সম্পূর্ণ না হওয়ার ফলে একটি বড় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যা বর্তমানে সংক্রমণ বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, ৩০ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট ২ হাজার ১৯০ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৬৭৬ জনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে বা উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়েছে। যদিও সংক্রমণ দেশের অধিকাংশ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে, রাঙামাটি, বাগেরহাট, মেহেরপুর, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও বান্দারবান এই আট জেলায় এখনো হাম শনাক্ত হয়নি।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। মোট আক্রান্তের ৬৯ শতাংশের বয়স দুই বছরের নিচে এবং ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসেরও কম, যা অত্যন্ত উচ্চ সংবেদনশীলতার ইঙ্গিত দেয়।
চিকিৎসকরা বলছেন, বিশেষ করে যেসব শিশু এখনো দুই ডোজ টিকা পায়নি বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
বর্তমানে প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় সংক্রমণের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ দশমিক ৮, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২২ সালে এই হার ছিল ১.৪১, ২০২৩ সালে ১.৬০, ২০২৪ সালে ১.৪৩ এবং ২০২৫ সালে ০.৭২ অর্থাৎ দীর্ঘ সময় নিয়ন্ত্রণে থাকার পর হঠাৎ করেই সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতি ২০২৬ সালের মধ্যে দেশ থেকে হাম ও রুবেলা নির্মূলের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
আরও পড়ুন: হামের প্রাদুর্ভাবে বাড়ছে শিশুমৃত্যু, চাপে স্বাস্থ্যব্যবস্থা
ভৌগোলিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সর্বাধিক রোগী শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগেও সংক্রমণের হার বেশি এবং একাধিক জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকাকে ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী আসা শুরু হলেও মার্চে ঈদের আগে তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
সাম্প্রতিক ২৪ ঘণ্টায় টাঙ্গাইল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহে হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আট মাস বয়সী এক শিশু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে আড়াই বছরের এক শিশু, ময়মনসিংহে চার মাস বয়সী এবং টাঙ্গাইলে আট মাস বয়সী আরেক শিশু চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রাদুর্ভাব মূলত একটি ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’-এর প্রতিফলন, যা দীর্ঘ সময় ধরে টিকাদানের অসমতা, আংশিক টিকাপ্রাপ্ত শিশু এবং সেবা প্রাপ্তিতে বাধার ফলে তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত টিকাদান নিশ্চিত না হলে এই সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর আকার আরও বাড়তে পারে এবং সংক্রমণ নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের জন্য জরুরি টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনা, রোগ শনাক্তকরণ ও নজরদারি জোরদার, দ্রুত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতকরণ, ভিটামিন ‘এ’সহ উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আগামী সপ্তাহের রবিবার থেকে দেশব্যাপী হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন না হলে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। তবে সময়মতো উচ্চমানের টিকাদান কর্মসূচি, সক্রিয় নজরদারি এবং কমিউনিটির সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা গেলে বর্তমান প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








