News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৯:৫২, ২ এপ্রিল ২০২৬

হামের প্রাদুর্ভাবে বাড়ছে শিশুমৃত্যু, চাপে স্বাস্থ্যব্যবস্থা

হামের প্রাদুর্ভাবে বাড়ছে শিশুমৃত্যু, চাপে স্বাস্থ্যব্যবস্থা

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

দেশের বিভিন্ন জেলায় আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে হামের সংক্রমণ। এতে করে একের পর এক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে এবং বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। বিশেষ করে শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজার, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে একাধিক শিশু। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত কেবল হামের কারণেই মৃত্যু হয়েছে ১৫ জনের। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী রবিবার থেকে দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। 

কক্সবাজারে সাত মাস বয়সী শিশু হিরা মণির মৃত্যু এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বুধবার (০১ এপ্রিল) সকালে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। 

মহেশখালী উপজেলার বাসিন্দা সরওয়ার আলমের এই সন্তানটি গত ৩০ মার্চ হাসপাতালে ভর্তি হয়। হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে। মুখে ঘা থাকায় স্বাভাবিকভাবে খেতে না পারায় নলের মাধ্যমে তাকে খাদ্য দেওয়া হচ্ছিল। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শহিদুল আলম জানান, অবস্থার ক্রমাগত অবনতির কারণে শিশুটিকে রক্ষা করা যায়নি। এ নিয়ে জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই।

এদিকে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ফলে এই হাসপাতালে এ ধরনের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চারজনে। এছাড়া কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক শিশুও একই উপসর্গে মারা গেছে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা ৩৩টি নমুনার মধ্যে ১৫টি মৃত্যুর সঙ্গে হামের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। রাজশাহী অঞ্চলে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ায় সেখানে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতি অনেক এলাকায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে ছয় মাস বয়সী যমজ দুই শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। একজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় নেওয়া হয়েছে, অন্যজন স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। একইভাবে শেরপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকেও শিশু আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আক্রান্ত অধিকাংশ শিশুই টিকা নেয়নি। তাই জ্বর ও শরীরে ফুসকুড়িযুক্ত রোগীদের সন্দেহজনক হাম হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন: দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব, রাজশাহীতে মৃত্যু বেড়ে ১৫

বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১৭ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৩ জন ভর্তি হয়েছে, মোট ভর্তি রোগী ৫২ জন। এছাড়া বিভিন্ন জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বহু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে।

সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ২০ শয্যার বিপরীতে শতাধিক রোগী ভর্তি রয়েছে। অনেক শিশুকে মেঝেতে শুইয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। একই অবস্থা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালেও, যেখানে ধারণক্ষমতার চার গুণ রোগী ভর্তি রয়েছে।

ওষুধ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেছেন, হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে না। বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে গিয়ে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য খরচ বহন করতে হচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ ফার্মেসিতেও পাওয়া যাচ্ছে না।

চিকিৎসক ও নার্সরা জানিয়েছেন, হাসপাতালে ওষুধের পর্যাপ্ত মজুত নেই। অক্সিজেন সুবিধা থাকলেও অনেক হাসপাতালে ভেন্টিলেশন সাপোর্টের অভাব রয়েছে।

ময়মনসিংহসহ কয়েকটি জেলায় টিকার ঘাটতির কথাও জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাম ও বিসিজি ছাড়া অন্য কোনো টিকা অনেক স্থানে মজুত নেই।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন হাসপাতালে আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে এবং বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। রোগীদের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার আগামী রবিবার থেকে সারাদেশে বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। কর্মসূচি সফল করতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ৯০ লাখ ডোজ টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং দ্রুত সব উপজেলায় সরবরাহ করা হবে।

হাম ও নিউমোনিয়াজনিত জটিলতা মোকাবিলায় আইসিডিডিআরবি উদ্ভাবিত ‘বাবল সিপ্যাপ’ প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হাম আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৩০ শতাংশ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং ৬ মাস থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত টিকাদান, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়