ইসরায়েলবিরোধী মন্তব্যে জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার ফ্রানচেস্কা আলবানেজ
ইসরায়েলবিরোধী মন্তব্য ও গাজা যুদ্ধ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার ফ্রানচেস্কা আলবানেজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বুধবার (৯ জুলাই) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
পরদিন বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এ তথ্য নিশ্চিত করে।
রুবিওর দাবি, আলবানেজ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) ইসরায়েলি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন।
তিনি বলেন, আলবানেজ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধ পরিচালনা করছেন। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে মার্কিন কোম্পানিগুলোর নাম আইসিসি-র রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যারা গাজায় ইসরায়েলকে সহায়তা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী, যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইসিসি-র মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে, তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।
ফ্রানচেস্কা আলবানেজের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার আওতায়:
- যুক্তরাষ্ট্রে তার ও পরিবারের সদস্যদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তার যাবতীয় সম্পদ জব্দ করা হবে।
- তিনি আর কোনো মার্কিন প্রতিষ্ঠান বা নাগরিকের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখতে পারবেন না।
নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে আলবানেজ আল জাজিরাকে পাঠানো এক বার্তায় জানান, তিনি এই পদক্ষেপ নিয়ে মন্তব্য করতে ইচ্ছুক নন।
তার ভাষায়, মাফিয়া স্টাইলের ভয়ভীতি প্রদর্শনের পদ্ধতি নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। আমি এখন ব্যস্ত আছি রাষ্ট্রগুলিকে তাদের দায়িত্ব মনে করিয়ে দিতে— গণহত্যা থামাও, শাস্তি দাও এবং যারা এসব থেকে লাভবান হচ্ছে, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনো।
তিনি ৯ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (পূর্বতন টুইটার) লিখেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আইসিসি-র ওয়ারেন্টভুক্ত হলেও তিনি অবাধে ইউরোপীয় আকাশপথ ব্যবহার করছেন, যা আন্তর্জাতিক আইনের অবমাননা।
তিনি আরও লিখেছেন, ইতালি, ফ্রান্স ও গ্রিসের জনগণের জানা উচিত, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন শুধু আইনেরই ক্ষতি করে না, সবাইকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
আরও পড়ুন: বিশেষ অভিযানের নামে লেবাননে প্রবেশ করল ইসরায়েল
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ কর্তৃক নিযুক্ত স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ হিসেবে ফ্রানচেস্কা আলবানেজ ২০২২ সাল থেকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করছেন। তার পদটি জাতিসংঘ মহাসচিব দ্বারা নিযুক্ত নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন পর্যবেক্ষণমূলক দায়িত্ব, যা কেবল মানবাধিকার পরিষদের আওতায় পড়ে।
আলবানেজ গাজার যুদ্ধকে “মানবতার বিরুদ্ধে চালানো নিষ্ঠুর অভিযান” হিসেবে বর্ণনা করে রিপোর্ট পেশ করেন। এসব রিপোর্টে তিনি সরাসরি ইসরায়েলকে দায়ী করেন এবং অভিযোগ করেন— গাজায় ফিলিস্তিনিদের খাদ্য, পানি, ওষুধসহ জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, যা যুদ্ধাপরাধের সামিল।
ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সাআর নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি জাতিসংঘে পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
ইসরায়েলের জাতিসংঘ দূত ড্যানি ড্যানন বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল।
এদিকে, আলবানেজকে বরাবরই তার পদ থেকে অপসারণের দাবিতে সোচ্চার ছিল ইসরায়েল। এমনকি চলতি সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতি আহ্বান জানায়, যেন তিনি আলবানেজের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানান এবং তার ম্যান্ডেট নবায়ন না করেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি’-এর নির্বাহী পরিচালক ন্যান্সি ওকাইল এ নিষেধাজ্ঞাকে “ভয়াবহ এবং কর্তৃত্ববাদী আচরণ” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একেবারে স্বৈরশাসকদের মতো আচরণ করছে। জাতিসংঘের একজন স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে তারা মানবাধিকার কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধ ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ২১ মাস অতিক্রম করেছে।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৫৭,৫৭৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশু ও নারী।
২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গালান্ত-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ— গাজার জনগণকে ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্য, চিকিৎসা ও পানি সরবরাহ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
ফ্রানচেস্কা আলবানেজের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুধু একজন ব্যক্তি নয়, বরং জাতিসংঘের মানবাধিকার কাঠামোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতার ওপর একটি বড় ধরনের আঘাত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকারের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা এবং ফিলিস্তিন সংকটের আন্তর্জাতিকীকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








