ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে বাড়ছে খাদ্যের দাম, জাতিসংঘের সতর্কতা
ছবি: নিউজবাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় প্রবেশ করেছে।
এফএওর সর্বশেষ মাসিক ‘ফুড প্রাইস ইনডেক্স’ অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য সূচক মার্চে দাঁড়িয়েছে ১২৮.৫ পয়েন্টে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, এটি টানা দ্বিতীয় মাসের মতো খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা।
সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়াই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, যা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে।
পণ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্চ মাসে খাদ্যশস্যের মূল্য সূচক মাসিক ভিত্তিতে ১.৫ শতাংশ এবং বার্ষিক ভিত্তিতে ০.৬ শতাংশ বেড়ে ১১০.৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। ভোজ্যতেলের মূল্য সূচক টানা তৃতীয় মাসের মতো বৃদ্ধি পেয়ে ১৮৩.১ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৫.১ শতাংশ এবং এক বছর আগের তুলনায় ১৩.২ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে পাম তেলের দাম ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং তা সয়াবিন তেলকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এ ছাড়া মাংসের মূল্য সূচক মার্চে ১২৭.৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় ১ শতাংশ এবং এক বছর আগের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি। দুগ্ধজাত পণ্যের মূল্য সূচক মাসিক ভিত্তিতে ১.২ শতাংশ বেড়ে ১২০.৯ পয়েন্টে উঠলেও, তা ২০২৫ সালের মার্চের তুলনায় এখনো ১৮.৭ শতাংশ কম অবস্থানে রয়েছে।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধের প্রভাব মার্কিনিদের পকেটে
চিনির বাজারেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এফএও বলছে, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চিনির দাম বেড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিশ্বের শীর্ষ চিনি রপ্তানিকারক দেশ ব্রাজিল আখ থেকে চিনি উৎপাদনের পরিবর্তে ইথানল উৎপাদনের দিকে ঝুঁকতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বিস্তারের আশঙ্কা বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই পথ দিয়ে বিশ্বে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল সরবরাহ হয়। ফলে এ অঞ্চলে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সংকট আরও বাড়তে পারে, যার প্রভাব খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর বেশি পড়বে।
এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল, তবে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় বর্তমানে তা দ্রুত বাড়ছে। যদিও বৈশ্বিকভাবে পর্যাপ্ত শস্য মজুদ থাকায় পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সংঘাত যদি ৪০ দিনের বেশি স্থায়ী হয় এবং উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ে, তাহলে কৃষকরা বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারেন। এতে চাষের পরিমাণ কমে যেতে পারে কিংবা ফসল পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা দিতে পারে, যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর আকস্মিক বিমান হামলা চালানোর পর থেকে অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা দেশগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দ্রুত প্রশমিত না হলে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা আরও বাড়বে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। ফলে খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








