যুদ্ধবিরতি নিয়ে পাল্টা শর্ত তেহরানের
ছবি: নিউজবাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে ঘনীভূত হওয়া যুদ্ধের কালো মেঘ সরাতে এক নাটকীয় কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে পাকিস্তান। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান ভয়াবহ উত্তেজনা প্রশমিত করতে ইসলামাবাদ একটি বিশেষ ‘দুই-ধাপের’ শান্তি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’ নামে পরিচিতি পাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান সরাসরি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে এবং দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর আল্টিমেটাম এবং ইরানের অনমনীয় শর্তাবলি এই শান্তি প্রচেষ্টাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
পাকিস্তান যে শান্তি রূপরেখা বা ফ্রেমওয়ার্ক প্রদান করেছে, তাতে মূলত দুটি ধাপের কথা বলা হয়েছে। প্রথম ধাপে ৪৫ দিনের জন্য একটি তাৎক্ষণিক ও সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হবে। এই সময়ের মধ্যে ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপে, সাময়িক বিরতির এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে স্থায়ী শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে ইসলামাবাদের মাটিতে সরাসরি আলোচনায় বসবে দুই পক্ষ। প্রস্তাব অনুযায়ী, চূড়ান্ত চুক্তিতে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, যার বিনিময়ে দেশটির ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং বিদেশে জব্দকৃত ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার শর্ত রাখা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি প্রাথমিকভাবে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) আকারে ইলেকট্রনিকভাবে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পাকিস্তানের এই প্রস্তাব তেহরান হাতে পেলেও তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো প্রকার ‘ডেডলাইন’ বা হুমকির মুখে তারা সংলাপে বসবে না।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি এবং আইআরজিসি-র জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা কেবল স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেলেই আলোচনায় আগ্রহী।
আরও পড়ুন: যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান: এক্সিওস
তেহরানের পক্ষ থেকে দুটি প্রধান শর্ত দেওয়া হয়েছে: প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে অবিলম্বে ইরানের শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালী নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, তা বিনাশর্তে প্রত্যাহার করতে হবে। ইরানের নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা, ৪৫ দিনের এই সাময়িক বিরতি মূলত তাদের শত্রুদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে। তাই স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে রাজি নয়।
এদিকে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাত ৮টার (ইস্টার্ন টাইম) মধ্যে ইরান যদি এই যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া না দেয়, তবে দেশটির জ্বালানি, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হবে।
ট্রাম্পের দাবি, সোমবারের মধ্যেই একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব, তবে তা না হলে যুদ্ধের তীব্রতা নাটকীয়ভাবে বাড়ানো হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির মধ্যে পরোক্ষ বার্তা আদান-প্রদান হলেও দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার চরম ঘাটতি এখনও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংকট নিরসনে পাকিস্তান এককভাবে নয়, বরং চীন, সৌদি আরব, মিশর ও তুরস্কের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। পাকিস্তানি সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির রোববার সারারাত মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানি নেতৃত্বের সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশও সতর্ক করেছেন যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে না আনলে এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আসবে না।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে। একদিকে পাকিস্তানের ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’ শান্তির আশা দেখাচ্ছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের আল্টিমেটাম এবং ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অনমনীয় অবস্থান পরিস্থিতিকে যেকোনো সময় একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। মঙ্গলবারের নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার আগেই বিশ্ববাসী তাকিয়ে আছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








