ইরান যুদ্ধের প্রভাব মার্কিনিদের পকেটে
ছবি: সংগৃহীত
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাত মার্কিন অর্থনীতির ওপর এক বিশাল আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশটির সাধারণ নাগরিকদের পকেটে।
পেন্টাগনের তথ্য ও সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই ব্যয়ের এক বিশাল রেকর্ড তৈরি হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই পেন্টাগনের আনুমানিক খরচ ছিল ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার, যা প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩২.৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এই বিপুল অর্থ ২০২৬ সালের পুরো মার্কিন প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় ০.১ শতাংশের সমান।
যুদ্ধ শুরুর মাত্র ছয় দিনের মাথায় পেন্টাগন জানায়, এই সংক্ষিপ্ত সময়েই তাদের ১১.৩ বিলিয়ন (১ হাজার ১৩০ কোটি) ডলার ব্যয় হয়েছে। নতুন হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম এক মাসেই মোট খরচের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি থেকে ৪৫ হাজার কোটি ডলারের মধ্যে। এই বিপুল ব্যয়ের বোঝা ভাগ করলে দেখা যায়, গড়ে প্রতিদিন একজন মার্কিন নাগরিকের ওপর প্রায় ২.৫ থেকে ৩.৮ ডলার খরচ পড়ছে, যার মধ্যম মান প্রায় ৩ ডলার। যদিও মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় খরচ কিছুটা কমেছে, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ওয়াশিংটন এখনো এই লড়াইয়ে প্রতিদিন গড়ে ৩৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয় করে চলেছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান ব্যয় হচ্ছে সরাসরি সামরিক খাতে। বিমান হামলা, নৌবাহিনীর উপস্থিতি এবং যুদ্ধজাহাজ পরিচালনার মতো সামরিক কর্মকাণ্ডে প্রতিদিন প্রায় ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার খরচ হচ্ছে। যুদ্ধের প্রথম মাসেই সামরিক ব্যয়ের পরিমাণ ২৩ থেকে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে পৌঁছেছে। আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং বিশাল সেনাবাহিনী মোতায়েনের এই ধারাবাহিক খরচ যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই বাড়তে থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ইরানকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, মার্কিন সেনাবাহিনী এখনো ইরানে যা অবশিষ্ট আছে তা ধ্বংস করা শুরুই করেনি।
আরও পড়ুন: কুয়েতে তেল শোধনাগারে ইরানের ড্রোন হামলা
তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হবে ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। ইতিমধ্যে তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরে নির্মাণাধীন বি১ সেতুতে বিমান হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম উঁচু সেতু হিসেবে পরিচিত ছিল।
সামরিক ব্যয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ধাক্কা এসেছে জ্বালানি তেলের বাজারের অস্থিরতার মাধ্যমে। সংঘাত শুরুর আগে তেলের দাম যেখানে ৭০ থেকে ৮০ ডলারের মধ্যে ছিল, তা এখন বেড়ে ১১০ থেকে ১১৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মূলত হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট ঝুঁকি, সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং বাজারের আতঙ্কের কারণে তেলের এই চড়া দাম সরাসরি পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল পণ্যের দাম বেড়ে গেছে, যাকে অর্থনীতিবিদরা সাধারণ মানুষের ওপর এক ধরনের ‘অদৃশ্য কর’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তেলের দাম বাড়ার এই প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
সরাসরি খরচের বাইরেও এই যুদ্ধের কিছু ‘অদৃশ্য’ ও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি মার্কিন অর্থনীতিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে। শেয়ারবাজারে ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদমূল্য হ্রাস পাওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের অবসরভাতা বা পেনশন ফান্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ে চলছিল, যুদ্ধ সেই চাপকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকারি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে সুদের হার এবং মর্টগেজ বা ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ, বর্তমান যুদ্ধের এই বিপুল আর্থিক দায়ভার বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও বহন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই সংঘাত দ্রুত নিরসন না হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা ও নিয়ন্ত্রণহীন মুদ্রাস্ফীতি তৈরি হতে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








