News Bangladesh

|| নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১১:৪৮, ১৮ এপ্রিল ২০১৫
আপডেট: ১৭:১৪, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

নেপথ্য কাহিনী

৬ হাজার টাকা ভাড়ায় টিনের ঘরে কেন?

৬ হাজার টাকা ভাড়ায় টিনের ঘরে কেন?

ঢাকা: টিনের ঘর, তাও আবার ডোবার নোংরা পানির ওপর, যেখানে সন্ধ্যে হলেই শুরু হয় মশার ভনভনানি। এমন পরিবেশে দশ হাত দৈর্ঘ্য, ৭ হাত প্রস্থের একটি কক্ষের মাসিক ভাড়া ৬ হাজার টাকা!

অবশ্য, এই টাকার সঙ্গে ডিশ, বিদ্যুৎ ও পানি ফ্রি। তবে সবচেয়ে অদ্ভূত ব্যাপারটি হচ্ছে, রামপুরা বউবাজার এলাকায় এর চেয়েও অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার টাকা কম ভাড়ায় পাওয়া যায় বিল্ডিং বাড়িতে রুম ভাড়া।

গত শুক্রবার রামপুরা বউবাজার মাটির মসজিদ এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, অসংখ্য আবাসিক ভবনে ‘টু-লেট’ বোর্ড ঝুলছে। অনেক বাড়ির দেয়ালে লাগানো রয়েছে স্থায়ী ‘টু-লেট’ সাইনবোর্ড। অর্থাৎ এসব বাড়িতে বছরের যে কোনো সময়ে ঘরভাড়া পাওয়া যায়। বেশ কয়েকটি বাড়ির মালিক ও তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৮ থেকে দশ হাজার টাকা ভাড়ায় দুই রুমের বাসা রয়েছে এ এলাকায়। এক রুমের বাসা নিতে গেলেও সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ হাজার টাকা ভাড়া লাগে।  কিন্তু এতো সুযোগ সুবিধার পরও মাসের পর মাস ফাঁকা রয়েছে সে সব দালান বাড়ি। ভাড়াটিয়া মেলে না।

অথচ, পাশেই ঝিলের ওপর অতি ঝুঁকিপূর্ণ কায়দায় তৈরি টিনের ওই সব বাড়ি নামক খুপড়িগুলোতে এক মুহুর্তের জন্যও ফাঁকা থাকে না কোনো ঘর। অনেকে আবার ৬মাস আগে থেকে লম্বা সিরিয়ালে অগ্রিম বুকিং দিয়ে রাখেন। খেটে খাওয়া নিম্নবিত্ত কেউ কেউ যদি একবার ওই বস্তিতে রুম ভাড়া পেয়ে যান, তো ভেবেই নেন তার রুটি রুজির ব্যবস্থা পাক্কা। এমনই বললেন স্থানীয়রা।

বিস্ময়কর এসব তথ্য জানা যায় ঝিলের ওপরের একটি খুপড়িবাড়ির তত্ত্বাবধায়ক আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে আলাপকালে। তিনি বউবাজার মাটির মসজিদের পাশের ঝিলে দেবে যাওয়া টিনের দোতলা বাড়ির ঠিক পাশের বাড়িটির দেখভাল করেন। মাস শেষে ভাড়া তুলে মালিকের কাছে তা পৌঁছে দেন। ঝিলের ওপর ঝুঁকিপূর্ণ বাসাগুলোর যে কারণে এতো ভাড়া, তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে যেসব তথ্য পাওয়া গেল, যা শুনে যে কারো চোখই কপালে উঠে যাবে।

রাতারাতি ‘উন্নত’ জীবন
টিনের এসব বস্তিতে একবার ভাড়াটিয়া হিসেবে পরিচিতি পেয়ে গেলে তার জন্য বৈধ-অবৈধ সব ধরনের আয়ের পথই খুলে যায়। সকাল-বিকেল আসতে থাকে নিত্য-নতুন ব্যবসার (কাজের) প্রস্তাব। রাজি হলেই উপহার হিসেবে টিনের কুটিরেই চলে আসে ফ্রিজ বা ওয়াশিং মেশিনের মতো আধুনিক গৃহস্থালী সামগ্রীও। দোতলা টিনের বাড়িটি দেবে যাওয়ার পরদিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল ডোবার নোংড়া পানি থেকে একটি লাল রঙের ফ্রিজ টেনে তুলছে।

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর হাসি আক্তার নামের এক বৃদ্ধা ফ্রিজটি নিজের বলে দাবি করেন। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৮ জনের পরিবার নিয়ে দোতলার পূর্ব দিকের একটি রুমে ভাড়া থাকতেন তিনি। রুমের ভাড়া ৬ হাজার টাকা। শিল্পী ও মুন্নি তার দুই মেয়ে। তারা রামপুরা এলাকার একটি গার্মেন্টে চাকরি করেন। মূলত তাদের উপার্জনেই সংসার চলে বলে দাবি করেন তিনি। কিন্তু তার দুটি ছেলেও রয়েছে। কালাম ও বাবুল নামের এই দুই তরুণ ধরাবাধা কোনো চাকরি করেন না। তারপরও প্রতি মাসে তারা ভালোই রোজগার করে বলে দাবি মা হাসি আক্তারের। তবে কীভাবে তারা উপার্জন করেন, তার কোনো জবাব দিতে পারেননি তিনি।

উদ্ধার অভিযানের সময়ে লাল রঙের ফ্রিজ ছাড়াও ঝিলের তলা থেকে টেনে তোলা সামগ্রীর মধ্যে ছিল ওয়াশিং মেশিন, হোম থিয়েটার সাউন্ড বক্স, মাইক্রোওয়েভ ওভেন প্রভৃতি।  

‘কর্মসংস্থানের’ সুযোগ
মাদক বিক্রি, অস্ত্র ব্যবসা, মিছিলে লোক সরবরাহ করা থেকে শুরু করে এই বস্তিতে অসংখ্য ‘কাজের’ সুযোগ রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এসব দাবির কিছুটা সত্যতাও মিলেছে দুর্ঘটনা পরবর্তী উদ্ধার কাজের সূত্রে। কারণ, দুর্ঘটনায় অজ্ঞাত ৩ ব্যাক্তির লাশ উদ্বার হয়েছে, যার মধ্যে ২ জনই নারী। কেউই তাদের পরিচয় জানাতে পারেননি। কিংবা তারা কারো অতিথি ছিলেন- এমনটাও দাবি করেননি কেউ। স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে  জানা যায়, টিনের ওই বাড়িটিতে সার্বক্ষণিক অজ্ঞাত পরিচয়ের লোকজনের আনাগোনা ছিলো।

পুলিশ থেকে নিরাপদ থাকা
সরকারি খাসের জায়গায় টিনের দোতলা তৈরি করে ভাড়া বাণিজ্য চালিয়ে আসছিলেন স্থানীয় যুবলীগ নেতা মনিরুজ্জামান মনি। অবৈধ এ কাজ চালানোর জন্য পুলিশকেও ম্যানেজ করতে হয়েছে তার। আর তাই এই বস্তিতে কখনই পুলিশের উপস্থিতি দেখা যেত না বলে দাবি স্থানীয়দের। সে সূত্রে এটা বিভিন্ন ধরনের অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয় ছিল বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তিরা।

অনেকেই থাকছেন অপারগ হয়ে
তবে, টিনের ওই সব বাড়িতে ভাড়া থাকা অনেকেই রয়েছেন, যারা নেহায়েত মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে-ই বেছে নেন এসব কুটির। এমনই একজন ভুক্তভোগী (দেবে যাওয়া টিনের দোতলার সাবেক বাসিন্দা) নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাদেশ.কমকে বলেন, “আখের রস বেইচা জীবন চালাই। অল্প টাকা আয়। তাই ৩ বছর আগে ২ সন্তান আর বউকে নিয়া এহানে একটা রুম ভাড়া করে থাকতে শুরু করি। পরে একটা সময় দেখতে পেলাম এখানে অনেক রকমের লোকজন আসে, মিছিল মিটিং-এ যাওয়ার জন্য চাপ দেয়; না গেলে  আবার মুখ খারাপও করে...”

এতো সব কিছু জেনে বুঝেও কেন এই বস্তিতে? জবাবে মাঝ বয়সী ওই ব্যক্তি বলেন, “কী আর করমু, রস বেচি রামপুরা বাজারে। এহান থ্যাইকা চইলা গেলে হেরা আমাগো কাজ কাম করতে দিবো না। এই ডরেই এতো দিন বাসা ছাড়তাম না।”

এখন তিনি পরিবারসহ পাশের আরেকটি বাসাতে উঠেছেন।

এখন কী করবেন, ঘরতো ভেঙে দিয়েছে? জবাবে বলেন, “হুনছি ডুবে যাওয়া বাড়ি ঠিক করতে দুই-আড়াই মাস সময় লাগবো, তারপরই হেইহানেই আবার রুম পামু। তাছাড়া অগ্রিম দেওয়া আছে আগের বাসার মালিকরে, তাই কেমনে চইলা যাই। গেলে তো ওই টাকাটা মাইর যাইবো। তাই, আপাতত পাশের বস্তিতেই আছি।”

এখন অনেকে অনেক কথা বলবে
তবে এসব অভিযোগকে আমলে নিতে নারাজ রামপুরা থানার ওসি মাহবুবুর রহমান। নিউজবাংলাদেশ.কমকে তিনি বলেন, “এখন অনেকে অনেক কথা বলবে, এগুলোতে কান না দিয়ে আগে ক্ষতিগ্রস্থদের উদ্ধার করতে হবে। এটা আমাদের  দায়িত্ব। ঝামেলা শেষ হলে এসব নিয়ে কথা বলবো।” এরপর হঠাৎ করেই ফোনের লাইন কেটে দেন। পরে বেশ কয়েকবার তার সেলফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

পুলিশের মতিঝিল জোনের  ডিসি আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “টিনশেডের ঘরগুলোর মালিক স্থানীয় যুবলীগ নেতা মনির চৌধুরী। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। ঘরগুলো বৈধ না অবৈধ বিষয়টি দেখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। যেহেতু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে সেহেতু আমরা আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।”

উল্লেখ্য, বুধবার দুপুরে রাজধানীর রামপুরার পূর্ব হাজীপাড়ার বৌবাজার এলাকায় ঝিলের উপর নির্মিত দুই তলা টিনসেডের একটি বাড়ি দেবে যায়। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত ১২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন আরো ২০ থেকে ৩০ জন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/একে

নিউজবাংলাদেশ.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়