যুদ্ধের আতঙ্কে ম্লান মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের ঈদ
ছবি: নিউজবাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এবার ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করতে যাচ্ছে লাখো প্রবাসী বাংলাদেশি, তবে উৎসবের চিরচেনা আনন্দের বদলে তাদের জীবনে নেমে এসেছে গভীর উদ্বেগ, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ওড়াউড়ি, হঠাৎ হামলার আশঙ্কা এবং নিরাপত্তা সতর্কতার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে। পাল্টাপাল্টি হামলার এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই আগামীকাল শুক্রবার (২০ মার্চ) সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হতে যাচ্ছে। তবে বরাবরের মতো উৎসবের আমেজ নেই সেখানে; বরং জীবন রক্ষায় এক শহর থেকে অন্য শহরে ছোটা আর মৃত্যুভয়ের উৎকণ্ঠায় কাটছে এই অঞ্চলে কর্মরত প্রায় ৫০ লাখের বেশি বাংলাদেশি, যাদের অনেকেই এখন জীবনঝুঁকি নিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। আনন্দের উৎসব এখন তাদের কাছে চরম অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের নাম। ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রবাসীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। কাতারে অবস্থানরত এক বাংলাদেশি জানান, এবারের ঈদে কোনো উৎসবের আমেজ নেই; বরং প্রতিনিয়ত সতর্কবার্তা, নিরাপত্তা জোরদার এবং জরুরি পরিস্থিতিতে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। অনেক এলাকায় চলাচল সীমিত করা হয়েছে এবং খোলা মাঠের পরিবর্তে মসজিদের ভেতরে ঈদের নামাজ আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন কুয়েতপ্রবাসীরাও। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেকের দেশে ফেরার পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে; বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বিদেশেই ঈদ কাটাতে হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন বড় জমায়েত নিষিদ্ধ করেছে এবং সবাইকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন ও ওমানেও প্রায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশি সামরিক ঘাঁটির আশপাশের এলাকাগুলোতে আতঙ্ক বেশি। কাতারের আল-শাহনিয়া, লুসাইল বা আল ওয়াবের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চলাচলে বিধিনিষেধ জারি রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দিনে একাধিকবার হামলার ঘটনাও ঘটেছে, যার ফলে দীর্ঘ সময় ঘরবন্দি থাকতে হয়েছে প্রবাসীদের। নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশে মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হচ্ছে এবং সাইরেন বাজলে কীভাবে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, কুয়েতে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য প্রশাসন বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে। ঈদের জামাত খোলা জায়গায় না হয়ে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়েছে। একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধর্মবিষয়ক কর্তৃপক্ষও। সৌদি আরবেও জনবহুল স্থান ও বাজারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে দেশটির মক্কা, মদিনা ও জেদ্দার মতো শহরে পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক রয়েছে, যদিও পূর্বাঞ্চলে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
আরও পড়ুন: মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ইরান: সংঘাত, স্বার্থ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু প্রবাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশে থাকা তাঁদের পরিবারগুলোও চরম উৎকণ্ঠায় দিন পার করছে। কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, মুন্সিগঞ্জ, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের প্রবাসী পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, টেলিভিশন ও সামাজিক মাধ্যমে যুদ্ধের খবর দেখে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই ঈদের কেনাকাটা পর্যন্ত করতে পারছেন না মানসিক অস্থিরতার কারণে। প্রিয়জনদের নিরাপদ কণ্ঠস্বর শোনার অপেক্ষায় দিন কাটছে অসংখ্য পরিবারের।
যুদ্ধ পরিস্থিতি অর্থনৈতিক দিক থেকেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রবাসীরা কর্মস্থলে যেতে না পারায় আয় কমে যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ঈদকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরি হয়, তা এবার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। অনেক প্রবাসী শ্রমিক চাকরি হারানোর ভয়েও রয়েছেন, বিশেষ করে যারা ইতোমধ্যে দেশে ফিরে এসেছেন বা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে।
চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলের প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে মিসাইল হামলার বিকট শব্দ ও বিস্ফোরণে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। অনেকেই জানিয়েছেন, হামলার সময় ভূমিকম্পের মতো অনুভূতি হয় এবং মুহূর্তেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এমনকি সামরিক ঘাঁটির আশপাশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
মানবিক সংকটও ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। লেবাননে চলমান সংঘাতে শত শত মানুষ নিহত ও লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো হামলার শিকার হওয়ায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। একইভাবে ইরানেও ব্যাপক হতাহত ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীর অঞ্চলেও চলমান সংঘাতের মধ্যে ঈদ উদ্যাপিত হচ্ছে, যেখানে অনেক পরিবার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বা আশ্রয়কেন্দ্রে ঈদ পালন করতে বাধ্য হচ্ছে। খাদ্যাভাব, চিকিৎসাসঙ্কট ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে সেখানে ঈদকে ‘দুঃখের ঈদ’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস প্রবাসীদের জন্য জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুদ্ধসংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রকাশ না করা, গুজব থেকে বিরত থাকা, সামরিক স্থাপনা ও সংবেদনশীল এলাকা এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সবসময় সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, এবারের ঈদুল ফিতর প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আনন্দের নয়, বরং এক অনিশ্চয়তা, ভয় এবং মানসিক চাপের অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের ছায়ায় উৎসবের রং ম্লান হয়ে গেছে; প্রার্থনা, সতর্কতা এবং নিরাপত্তা এই তিনটিই এখন তাঁদের ঈদের প্রধান বাস্তবতা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








