ক্ষমতা, যৌনতা আর অপরাধের গোপন জাল এপস্টেইন ফাইল
ছবি: সংগৃহীত
‘এপস্টেইন ফাইল’বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত নথির নাম। বিশ্ব রাজনীতির শীর্ষ নেতা, রাজপরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে বিনোদন ও প্রযুক্তি জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে এই নথিতে।
‘এপস্টেইন ফাইল’ বলতে জেফ্রি এপস্টেইনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তদন্তে সংগৃহীত আইনি নথিপত্র, ইমেইল, ছবি, ফ্লাইট লগ এবং ভুক্তভোগীদের জবানবন্দির বিশাল সংকলনকে বোঝানো হয়। এসব নথি মূলত মার্কিন বিচার বিভাগ ও ফেডারেল তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের তদন্তের অংশ। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ফাইল একটি আন্তর্জাতিক শিশু পাচার ও যৌন শোষণ চক্রের দালিলিক চিত্র তুলে ধরে।
মার্কিন অর্থলগ্নিকারী ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন এবং তার সহযোগী গিলেইন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে দীর্ঘ তদন্তের পর আদালতের নির্দেশে প্রকাশিত হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথি এখন বিশ্বব্যাপী তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই ফাইল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার প্রধান কারণ এতে থাকা বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম। সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান, রাজপরিবারের সদস্য, ধনকুবের এবং বিনোদন জগতের তারকাদের সঙ্গে এপস্টেইনের যোগাযোগের তথ্য নথিতে উঠে এসেছে। যদিও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে নথিতে নাম থাকলেই কেউ অপরাধী প্রমাণিত হন না, তবে এসব সংশ্লিষ্টতা বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি করেছে।
এপস্টেইন ও তার অপরাধ
যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত জেফ্রি এপস্টেইন ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি কারাগারে মারা যান। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌনকর্মে যুক্ত করা ও পাচারের অভিযোগে বিচারকাজ চলাকালীন তার মৃত্যু হয়, যা আজও রহস্য ও বিতর্কের জন্ম দেয়।
এর আগে, এক দশকেরও বেশি সময় আগে অপ্রাপ্তবয়স্ক এক মেয়েকে যৌনকর্মে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার অপরাধে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন এবং যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত হন। তার বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে একটি বিস্তৃত যৌন শোষণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ ছিল, যদিও তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে গেছেন।
হাসিনা যুগের সমাপ্তি? আল জাজিরাকে জয় বললেন, ‘সম্ভবত তাই’
‘পাপের দ্বীপ’ও গোপন নথি
প্রকাশিত নথিতে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপ ‘লিটল সেন্ট জেমস’-এর ভয়াবহ বর্ণনা পাওয়া যায়, যা ‘পাপের দ্বীপ’ নামে পরিচিত। এ ছাড়া তার ব্যক্তিগত বিমান ‘ললিটা এক্সপ্রেস’-এর ফ্লাইট লগ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে দেখা যায় কারা নিয়মিত ওই দ্বীপে যাতায়াত করতেন। ভুক্তভোগীদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে ভয়ংকর নির্যাতনের বিবরণ।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের হাউস ওভারসাইট কমিটির সদস্যরা এপস্টেইনের ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের বাসভবনের আগে অপ্রকাশিত কিছু ছবি প্রকাশ করেন। ছবিগুলোতে একাধিক শয়নকক্ষ এবং দেয়ালে ঝোলানো মুখোশ দেখা যায়, যা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
নথিতে যাদের নাম এসেছে, তাদের সবাই যে অপরাধী—এমন দাবি করা হয়নি। তবে উল্লেখযোগ্য নামগুলোর মধ্যে আছেন-
ব্ল্যাকমেইল
সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ হলো—এপস্টেইনের বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেইল ষড়যন্ত্রের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, তার দ্বীপে আসা ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের যৌন কর্মকাণ্ড গোপনে ধারণ করে তা দিয়ে পরবর্তী সময়ে চাপ সৃষ্টি করা হতো। যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি রায় এখনও নেই, তবু নথিতে থাকা তথ্য বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ট্রাম্প প্রসঙ্গ
প্রকাশিত কিছু নথিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উঠে আসায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তবে ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া গিফ্রে নিজেই মৃত্যুর আগে জানিয়েছিলেন, তিনি ট্রাম্পকে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত দেখেননি। ট্রাম্পও দাবি করেছেন, এপস্টেইন প্রথমবার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত নথিতে তার বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মাইকেল জ্যাকসন
এই তালিকায় বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও তারকার নাম উঠে এসেছে, যার মধ্যে পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের নাম থাকা নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। নথিপত্র অনুযায়ী, জ্যাকসন একবার ফ্লোরিডার পাম বিচে জেফরি এপস্টেইনের বিলাসবহুল প্রাসাদে গিয়েছিলেন, যা নিয়ে ভক্ত ও সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্নের উদয় হয়েছে।
আদালতের নথি এবং সাক্ষ্য থেকে জানা গেছে, মাইকেল জ্যাকসন এপস্টেইনের সেই বিতর্কিত প্রাসাদে উপস্থিত থাকলেও তার বিরুদ্ধে কোনো অনৈতিক কাজের প্রমাণ বা অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এপস্টেইনের অন্যতম সহযোগী ও অভিযোগকারী জোহানা সজোবার্গ তার সাক্ষ্যে জানিয়েছেন, তিনি সেই প্রাসাদে থাকাকালীন মাইকেল জ্যাকসনকে দেখেছিলেন। তবে জ্যাকসন সেখানে কোনো অপ্রীতিকর কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন না কিংবা কারও কাছ থেকে কোনো বিশেষ ‘সেবা’ গ্রহণ করেননি। সজোবার্গের ভাষ্যমতে, জ্যাকসনের উপস্থিতি ছিল নিতান্তই সামাজিক বা সৌজন্যমূলক।
নিউজবাংলাদেশ.কম/এনডি








