News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০০:০৯, ১১ মে ২০২৫

রাজনৈতিক সংকটে কঠিন পদক্ষেপ: নিষিদ্ধ হলো আওয়ামী লীগ

রাজনৈতিক সংকটে কঠিন পদক্ষেপ: নিষিদ্ধ হলো আওয়ামী লীগ

ছবি: সংগৃহীত

অন্তর্বর্তী সরকারের এক যুগান্তকারী ঘোষণায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সূচিত হলো নতুন এক অধ্যায়। দীর্ঘদিনের সহিংসতা, দমনপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অবশেষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বর্তমান প্রশাসন। 

শনিবার (১০ মে) রাত ৮টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

বৈঠক শেষে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল গণমাধ্যমকে জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইনের সংশোধনী অনুমোদিত হয়েছে, যা রাজনৈতিক দল বা এর অঙ্গসংগঠনকে বিচারের আওতায় আনার পথ খুলে দিয়েছে। 

নতুন আইনের অধীনে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর নেতাদের বিরুদ্ধে বিচার চলা পর্যন্ত দলটির সব কার্যক্রম, বিশেষ করে অনলাইন ও সাংগঠনিক উপস্থিতি, স্থগিত থাকবে।

ড. আসিফ নজরুল বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে সংশোধনী এনে রাজনৈতিক দলকেও শাস্তির আওতায় আনার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এতে করে কোনো দল, সংগঠন বা সমর্থক গোষ্ঠী মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকলে, তারা বিচারের মুখোমুখি হতে পারবে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও এর নেতাদের বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলের সকল কার্যক্রম, বিশেষ করে সাইবার স্পেসে, নিষিদ্ধ থাকবে। 

এই নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য হলো দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জুলাই আন্দোলনের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বাদী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা প্রদান করা। প্রয়োজনীয় পরিপত্র পরবর্তী কর্মদিবসে জারি করা হবে বলে জানানো হয়েছে । 

আরও পড়ুন: আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে শাহবাগে গণজমায়েত

এর আগে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সংগঠনটির বিরুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন, টেন্ডারবাজি, ধর্ষণ এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছিল।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ছাত্রলীগ নিষিদ্ধকরণের মধ্য দিয়ে যা শুরু হয়েছিল, তা আজকের এই সিদ্ধান্তে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক নীতির রূপ পেয়েছে।

আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞার পেছনে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতে ইসলামীসহ একাধিক দল ও ধর্মভিত্তিক সংগঠনের দীর্ঘদিনের দাবি ও আন্দোলন বড় ভূমিকা রেখেছে।

জুলাই-অগাস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকারের পতনের পরই এসব দাবির ভিত্তি দৃঢ় হয়। এনসিপি ও সংশ্লিষ্ট দলগুলো আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তোলে।

বুধবার মধ্যরাতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ দেশ ছাড়ার পর থেকেই আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকে।
এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার রাতের এই সিদ্ধান্ত এলো, যা কার্যত আওয়ামী লীগের ওপর একধরনের রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঘন ঘন গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, এবং বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের নথিভুক্ত অভিযোগ ছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে এই প্রতিবেদনগুলোকেও আংশিক ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক প্রতিনিধিদল এই বিষয়ে পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে।

উপদেষ্টা পরিষদের আজকের বৈঠকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে: আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে “জুলাই ঘোষণাপত্র” চূড়ান্ত করে জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে। এই ঘোষণাপত্রে অন্তর্ভুক্ত থাকবে নতুন সংবিধান প্রণয়নের রূপরেখা, নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন, এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারপন্থী শক্তির সমন্বয়ে একটি নির্বাচিত সরকার গঠনের প্রস্তাবনা।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধকরণ যতটা প্রতীকী, তার চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে — রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় পরিবর্তনের কাঠামো গঠন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়