ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
জোনায়েদ সাকির নির্বাচনী ইশতেহার
ঢাকা: সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঢাকা উত্তরে মেয়র পদপ্রার্থী জোনায়েদ সাকি নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছেন। জাতীয় প্রেসক্লাবে শনিবার বিকেলে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি এ ইশতেহার ঘোষণা করেন। তিনি ‘টেলিস্কোপ’ মার্কা নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গণসংহতি আন্দোলনের এ মেয়র প্রার্থীকে ইতিমধ্যে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। এর মূল কারণ তার কথা ও কলঙ্কমুক্ত অতীত। দুই দল ও দুই জোটের বাইরে ভিন্ন কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভোটারদের মধ্যে তাকে নিয়ে বেশ আগ্রহও তৈরি হয়েছে। তার পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী ইশতেহারটি নিচে দেয়া হলো:
১। প্রস্তাবনা
নাগরিক মর্যাদার প্রতিষ্ঠা হবে নগর কর্তৃপক্ষের অভীষ্ট।
নাগরিকতার প্রাথমিক আবশ্যক শর্তই হলো তার নাগরিক মর্যাদা। একজন নাগরিককে কোন নগর যখন তার অবশ্য প্রাপ্য অধিকারগুলো বিনা হয়রানিতে বুঝিয়ে দেয়, তখন নগরের প্রতিও তার কিছু দায়িত্ব বর্তায়। অধিকার আর কর্তব্যের এই পারস্পরিক লেনদেনের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে নাগরিক মর্যাদার বোধ। গড়ে ওঠে একটা বাসযোগ্য নগর। দুঃখজনক হলেও ঢাকা মহানগরীর বাসিন্দারা সেই নাগরিক মর্যাদার অধিকারী নন। এই নগরীকে তার বাসিন্দারা আপন বলে ভাবতে পারেন না। এই নগরে শিশুদের শৈশব চুরি হয়ে যায় চার দেয়ালের মাঝে, নারীর জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পরিবর্তে আছে অবমাননা, অবহেলা আর আতঙ্ক। বাসের জন্য অপেক্ষায় কিংবা যানজটে কেটে যায় জীবনের মূল্যবান সময়। দরিদ্রতর নাগরিকদের কাছে ন্যূনতম সেবাগুলো পৌঁছে দেয়ার কোন উদ্যোগ নেই। গতিহীন নগরীর অধিবাসীদের উৎপাদনশীলতাও সঙ্গতকারণেই বেশ কম। অন্যদিকে, অধিকারহীন নাগরিকেরাও নগরকে পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে থাকেন উদাসীন, সুযোগ পেলেই নাগরিক শৃঙ্খলা ভাঙা এখানে রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই অধিকারগুলো ভোগ এবং দায়িত্বগুলো পালনের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে একটা সুখী জনপদ, নাগরিক অর্জন করেন তার মর্যাদা। এই মর্যাদার প্রতিষ্ঠাই আমাদের উদ্দেশ্য।
নাগরিক মর্যাদার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একটা মানবিক, প্রকৃতিবান্ধব, শিশুর প্রতি দায়িত্বশীল, নারীর জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ, তরুণ প্রজন্মের কর্মোদ্দীপনার উপযোগী প্রাণচঞ্চল রাজধানী প্রতিষ্ঠার তাগিদ থেকেই আমরা এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি।
২। পরিচালনার মূলনীতি
দুর্নীতিমুক্ত এবং জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক নগর প্রশাসন পরিচালনাই হবে আমাদের মূলনীতি।
বাংলাদেশে সর্বত্র স্থানীয় সরকারগুলোকে প্রায় সম্পূর্ণ অকার্যকর করে রাখা হয়েছে, পরিণত করা হয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত একটা সংস্থায়। ১২০টি দায়িত্ব পালন ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এর কাজের তালিকায় থাকলেও হোল্ডিং ট্যাকস ছাড়া আর বড় কোন আয়ের উৎস এর নেই, রাজস্বের বাকি উৎসগুলো দখলে রেখেছে সরকার। মোট ব্যায়ের বড়জোড় ৬০ শতাংশ নিজস্ব আয় থেকে আসে। এভাবে স্থানীয় সরকারকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।[i] এর ফলে একদিকে যে কোন উন্নয়নমূলক কাজ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আমলাতান্ত্রিকতার জালে আটকা পড়ে, দুর্নীতি আর জবাবদিহিতাহীন পরিবেশ তৈরি হয়; অন্যদিকে নগর পরিচালনার জন্য নির্বাচিত জনগণের প্রতিনিধিরাও নামমাত্র আলঙ্কারিক ব্যক্তিতে পরিনত হন। এর ব্যয়ের স্বচ্ছতা বিপুলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। নগরবাসীর চোখে সিটি কর্পোরেশন দুর্নীতি আর ঠিকাদারির ভাগ-বাটোয়ারার অন্যতম প্রধান আখড়া।
বর্তমান সরকার জনগণের কোন মতামত গ্রহণ না করেই নগরকে স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় দ্বিখণ্ডিত করেছে। একই ভৌগোলিক অখণ্ডতায় গড়ে ওঠা একটি নগরীকে দুটুকরো করাকে ঢাকার জনগণ মেনে নেননি, আমরাও এটাকে প্রশাসনিক কিংবা অবকাঠামো কোন দিক থেকেই নাগরিক সুবিধার জন্য সুবিধাজনক বলে মনে করি না। বরং বিদ্যমান ওয়ার্ডগুলোকেই আরও ক্ষমতাশালী ও কার্যকর সেবা প্রদান কেন্দ্রে পরিণত করেই বিকেন্দ্রীকরণের কাজটি সম্পন্ন হতে পারে, নগর কর্তৃপক্ষ যার কেন্দ্রীয় সমন্বয়ের কাজটি করতে পারবে। ঐক্যবদ্ধ ও সুসমন্বিত কর্তৃপক্ষ ছাড়া ঢাকাকে বাসযোগ্য করা, সবগুলো পরিষেবা সুষ্ঠভাবে প্রদান করা প্রায় অসম্ভব কাজ।
আমাদের প্রথম ও প্রধান প্রস্তাব তাই ঢাকা নগরের আওতার মাঝে সবগুলো সেবাপ্রদানকারী সংস্থাকে সমন্বিত করে একটি স্বশাসিত নগর সরকার প্রতিষ্ঠা করা।
বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসেরও গূরুত্বপূর্ণ অংশ স্থানীয় সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। পরিষেবাগুলো জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার কাজটি আমলাতন্ত্রের হস্তক্ষেপমুক্ত ভাবে পরিচালনা এবং স্থানীয় ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন, তদারক ও বাস্তবায়ন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠারই গূরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সকল ক্ষমতা আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনযন্ত্রের হাতে কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছে; সেটাকে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা এবং জনগণের প্রত্যক্ষ তদারকির আওতায় আনতে সক্ষম হবে এমন একটি নগর সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য জনরায় গ্রহণ করতেই আমরা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি।
৩। নাগরিকদের অধিকার
ক. ঢাকা নগরীর বাসিন্দাদের প্রধান কর্মশক্তি এর তরুণ জনগোষ্ঠী। আমাদের লক্ষ থাকবে উৎপাদনশীলতার সর্বোচ্চ বিকাশের অনুকূল একটি পরিবেশ ঢাকা নগরে গড়ে তোলা। তরুণদের কর্মোদ্দীপনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা আধুনিক নগর নির্মাণের অন্যতম শর্ত। ঢাকা নগরীকে অবিলম্বে ওয়াইফাই প্রযুক্তির আওতায় এনে সকলের জন্য ন্যূনতম ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।[ii] বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগামী তরুণদের জন্য বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থার বন্দোবস্ত করা হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য সকল বাসে অর্ধেক ভাড়াগ্রহণ বাধ্যমূলক করা হবে। নগর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে প্রযুক্তি শিক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন বিদেশী ভাষার শিক্ষার ব্যবস্থা করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
খ. ঢাকা নগরের প্রায় অর্ধেক বাসিন্দা নারী। অথচ নারীর জন্য এই নগরী রীতিমত শত্রুশিবির। আমরা এই অবস্থার অবসান ঘটাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা ঘোষণা করছি, ঢাকা শহরকে আমরা নারীদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ একটি নগরে রূপান্তরিত করবো।
প্রতিটি ওয়ার্ডে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা করা হবে।[iii] ভীড়ের সময়ে নগর পরিবহনে নারীদের ঠাঁই পাবার উপায় থাকে না বলে তাদেরকে বাড়তি অর্থ খরচ করতে হয় রিকশা আর সিএনজি ট্যাক্সিতে। নগর পরিবহন পর্যাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত নারীদের জন্য পর্যাপ্ত পৃথক বাস সার্ভিস চালু করা হবে। কর্মজীবী নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা নগর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে করা হবে। এমনকি একদিনের জন্য ঢাকায় আসা একাকী নারীর জন্যও নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিটি ওযার্ডে পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হবে, গার্মেন্টসহ বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ডেকেয়ার সেন্টার রাখা বাধ্যতামূলক করা হবে। স্থানের অভাব হলে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ডেকেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হবে।
নারীদের জন্য জরুরি সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। সকল সড়কে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হবে। যে কোন নারী যেন নিরাপদে, নিশ্চিন্তে নগরে চলাফেরা করতে পারেন, তার জন্য প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং উত্যক্তকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে কম্যুনিটি পুলিশের ব্যবস্থা করা হবে, যেখানে নারীদের সংখ্যা থাকবে উল্লেখযোগ্য পরিমানে। আগ্রহী নারীদের জন্য নগর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে খালি হাতে আত্মরক্ষার কৌশল শেখাবার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
গ. আগামীর ঢাকা গড়া আমাদের লক্ষ্য, তাই শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ হবে এর প্রধান কর্মসূচি। পর্যাপ্ত খেলার মাঠের অভাবে এই শিশুরা আজ একাকী ঘরে বিচ্ছিন্ন হয়ে বড় হচ্ছে, টেলিভিশন তাদের প্রধান বিনোদন। শরীরের দিক দিয়ে যেমন তারা সবল হয়ে বেড়ে উঠছে না, মনের দিক দিয়েও তারা বিচ্ছিন্নতাবোধ, আত্মসর্বস্বতা ও হতাশার শিকার হচ্ছে। মাদকের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে তারা, সমষ্টির প্রতি দায়বোধ এবং সমাজের একজন হয়ে বেড়ে ওঠার শিক্ষাটাও তাদের হচ্ছে না।
আমরা ঘোষণা করছি প্রতিটি শিশুর জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা হবে নগর সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচি। এমনভাবে শিশুদেরকে এই নগরীতে বেড়ে ওঠার সুযোগ থাকতে হবে যেন তার শৈশবের মধুর স্মৃতি জড়িয়ে থাকে এই নগরীর সাথে। যেন সে আজীবন নগরীর প্রতি, দেশের প্রতি এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ একজন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। প্রতিটি খেলার মাঠ দখলমুক্ত করা হবে, বিদ্যমান মাঠগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা করা হবে। ছুটির সময়েও বিদ্যালয়গুলোর মাঠ যেন শিশু-কিশোররা ব্যবহার করতে পারে, তার জন্য প্রয়োজনীয় বন্দোবস্ত করা হবে।
ঘ. প্রবীণ নাগরিকরা জীবনভর শ্রম দিয়েছেন এই নগরীকে গড়ে তোলার জন্য। অথচ এই নগরী তাদের প্রতি রূঢ়। তাদের জন্য সকল সেবা গ্রহণের বেলায় বিশেষ অগ্রাধিকার এবং যে কোন সেবা ছাড়কৃত মূল্যে নিশ্চিত করা হবে। তাদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য সুবিধার ব্যবস্থা করা হবে। বিশেষ করে পরিবহন ও চিকিৎসা গ্রহণের জন্য তাদের যেন লম্বা সময় অপেক্ষা না করতে হয়, সেটার ব্যবস্থা করা হবে।
ঙ. কোন নগরী মানবিক কি না, তার একটা মানদণ্ড হলো সেখানে শারীরিক প্রতিবন্ধিতা সম্পন্ন মানুষদের জন্য অনায়াস চলাচল নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, সেটা। অথচ এই দেশে রাস্তাঘাটে চলাফেরায়, হাসপাতাল, রেলগাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ পাবলিক প্রতিষ্ঠানে তাদের সুযোগসুবিধার প্রতি সামান্যই নজর দেয়া হয়। আমরা নির্বাচিত হলে প্রতিটি পাবলিক প্রতিষ্ঠানে, পরিবহনে তাদের জন্য বিশেষ বন্দোবস্ত গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হবে। ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ঘরবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রমশঃ এই আইনের আওতায় আনা হবে।
৪. প্রকৃতি ও পরিবেশ
ক. ভৌগোলিক দিক দিয়ে ঢাকার যে অনন্যতা ছিল, তা এই নগরীর বাসিন্দাদের জীবনকে আনন্দময়, স্বাস্থ্যকর আর প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর করে তুলতে পারতো। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ আর বালু এই চার-চারটি নদী বেষ্টিত ঢাকার মাঝ দিয়েও প্রবাহিত ছিল অনেকগুলো খাল, ছিল জলাশয়। এমন অসাধারণ সুবিধার অধিকারী একটি নগরীর বাসিন্দাদের জীবন এতটা দুর্বিষহ হবার কথা তো ছিল না। বসবাসের অযোগ্য নগরীর তালিকায় ঢাকার ঠাঁই হবারও কথা ছিল না। প্রকৃতি-পরিবেশ ধ্বংস হয়ে এখন ঢাকা একটি ফুসফুসবিহীন নগরে পরিনত হয়েছে।
কারখানার বর্জ্যের কারণে দূষিত এবং উৎকট গন্ধযুক্ত নদীর পানিই নাগরিকদের সরবরাহ করা হচ্ছে। হাজার কোটি টাকা খরচ করে ব্রহ্মপুত্র থেকে পানি এনে ঢাকায় সরবরাহের পরিকল্পনা করা হচ্ছে; অথচ এরচে অনেক কম খরচে কারখানাগুলোর দূষণ রোধ করে এই চারটি নদীর পানি ব্যবহার করা সম্ভব। নির্বাচনের সময়ে জনগণকে ভোলাবার জন্য বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে ট্যানারি সরিয়ে নেয়ার হাকডাক দেয়া হয়, কিন্তু বাস্তবায়ন করা হয় না। জনগণের আশঙ্কা, ট্যানারি শিল্পের জন্য বিকল্প স্থান বহু আগেই সাভারে নির্দিষ্ট করা হয়ে গেলেও অন্য কোন স্বার্থসংশ্লিষ্টতার কারণে সেটা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। দূষণ-দখলদারিত্ব না ঠেকালে মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে রাজধানী শহরটি। প্রকৃতি না বাঁচলে ঢাকা বাঁচবে না, দেশ বাঁচবে না। ঢাকায় ২০০ ট্যানারি প্রতিদিন ৭.৭ মিলিয়ন লিটার তরল বর্জ্য আর ৮৮ মিলিয়ন টন কঠিন বর্জ্য উৎপাদন করে। এর সামান্য অংশই পরিশোধন বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হয়। [iv] আরও বহু শিল্পকারখানা বিপুল পরিমান রাসয়নিক দ্রব্য সরাসরি নদীতে ঢেলে চলেছে।
ঢাকা নগরীর প্রকৃতি পরিবেশ রক্ষা করতে আমরা কঠোর ভূমিকা গ্রহণ করবো। জনগণকে সাথে নিয়ে এক বছরের মাঝে এর নদীদূষণ সৃষ্টি কারী সকল কারখানাকে হয় সম্পূর্ণ কার্যকর পানিপরিশোধনাগার চালু করতে বাধ্য করা হবে, নয়তো সেগুলোকে স্থানান্তর করা হবে, এই আমাদের প্রতিজ্ঞা।
খ. ২০০১ সালের একটা গবেষণা অনুযায়ী কেবল বায়ু দূষণের কারণে দেশে ১৫ হাজার শিশু প্রতি বছর মৃত্যুবরণ করে, এর বড় অংশ ঢাকাতেই![v] গত পনেরো বছরে এই সংখ্যা সন্দেহাতীতভাবেই আরও বেড়েছে। কালো ধোঁয়া, সীসা নির্মাণ কাজের ধূলো এখানে বায়ু দূষণের প্রধান কারণ। এত শিশু যেখানে সমাধানযোগ্য একটা কারণে মারা যায়, সেখানে লক্ষ লক্ষ শিশু-নারী-পুরুষ নিশ্চয়ই অসুস্থ হয়; হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, মাইগ্রেন আর দুর্বল ফুসফুস ভবিষ্যত প্রজন্মের জীবনী শক্তি কমিয়ে এভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। দূষণের কারণে শত শত কোটি টাকার বাড়তি ওষুধ কিনতে হয় নগরবাসীকে। শব্দদূষণের কারণে শ্রবণশক্তির ঘাটতি এবং নানান স্নায়বিক রোগের প্রসার ঘটছে। এমন একটা নগরী কি আমরা চেয়েছিলাম যেখানে জমির দাম নিউ ইয়র্কের সমান, অথচ পরিচ্ছন্নতার জন্য বরাদ্দটাও হয় চুরি হয়ে যাবে কিংবা অপরিকল্পনার কারণে অপচয় হবে?
আমরা অঙ্গীকার করছি, কোন ঢাকাবাসীকে নাকে-মুখে রুমাল চেপে কিংবা মুখোশ পরে রাস্তায় হাঁটতে হবে না। আমরা নির্বাচিত হলে ধুলোবালি-ময়লা-আবর্জনা ঝাড়ু দিয়ে রাস্তার পাশে স্তুপ করে রাখা হবে না, তাৎক্ষণিকভাবে তা সরিয়ে নেয়া হবে। সকল ময়লা রাতের ভোরের আগেই অপসারণ করা হবে। নাগরিকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে যেন তারা জৈববর্জ্য, প্লাস্টিক ও কাজের বর্জ্য ভিন্ন ভিন্ন মোড়কে ডাস্টবিনে জমা করেন। এতে বর্জ্যসংগ্রহের পরিস্থিতির উন্নতি হবে। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের মানবেতর ও অস্বাস্থকর পোষাক ও যন্ত্রপাতির উন্নতি ঘটানো হবে।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জৈব গ্যাস উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হবে। বহু দেশেই বর্জ্য থেকে লাভজনকভাবে জ্বালানি উৎপাদনের কাজে ব্যয় করা হয়, এতে একদিকে পরিবেশ দূষণ বন্ধ হয়, অন্যদিকে সেটা যথেষ্ট সুলভও।[vi]
ট্রাকে-পিকআপে বালু-সিমেন্ট-মাটি উন্মুক্ত অবস্থায় পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হবে। জনগণের সড়কে নির্মাণ সামগ্রী রাখা মাত্র তা নগর-কর্তৃপক্ষ বাজেয়াপ্ত করবে, জরিমানা আদায় করবে। দশ কোটি টাকার নির্মাণ কাজে অন্তত পাঁচ লক্ষ টাকা কর বসানো হবে নির্মাণ কাজ জনিত ধুলো অপসারণের জন্য।
গ. ঢাকার দখলদারদের বৈধ করার নানান তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। সিএস ম্যাপে বুড়িগঙ্গা নদীতে অবৈধ দখলের সংখ্যা তিন হাজার হলেও আরএস ম্যাপে এই দখলের সংখ্যা মাত্র দুশো। এমনকি ঢাকার নতুন ডিটেইলড এরিয়া প্লানে বহু জলাভূমিকে আবাসিক এলাকা হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে। আমরা অঙ্গীকার করছি যে, মেয়র নির্বাচিত হলে দখলবারদের হাত থেকে প্রকৃতি রক্ষায় আমরা যথাসম্ভব ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। নদীগুলোর অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে নদীর প্রবাহ যথাযথ করা হবে, জলাভূমিগুলো যথাসম্ভব প্রাকৃতিক অবস্থায় ফেরত এনে বন্যা প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। এছাড়া অন্য দখলবাজদের উচ্ছেদ করে সেখানে কম্যুনিটি সেন্টার, মিলনায়তন, পাঠাগার, ডেকেয়ার সেন্টার, স্বাস্থকেন্দ্রসহ নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবাদানকেন্দ্রগুলো স্থাপন করা হবে।
ঘ. দেড়-দুই কোটি মানুষের অক্সিজেন সরবরাহের জন্য যে পরিমান গাছপালা থাকার কথা ছিল তা ঢাকায় নেই। ঢাকা উত্তরের কোন কোন এলাকা একেবারে বৃক্ষশূন্য। মেয়র নির্বাচিত হলে এই শহরকে একটি সবুজ, প্রকৃতি পরিবেশের নগর গড়ে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা আমরা করবো। রাস্তায় এবং ফাঁকা স্থানে অজস্র প্রজাতির এবং বৈচিত্রের ফলদ ও ওষধি গাছ রোপন করা হবে। প্রতিটি বাড়ির ছাদে বাগান করার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরী সহায়তা-প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা যেমন নগর কর্তৃপক্ষ করবে, তেমনি নামমাত্র মূল্যে চারা-বীজ সরবরহের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি নার্সারি স্থাপন করা হবে। উপযুক্ত স্থান না থাকলে ভ্রাম্যমান নার্সারির ব্যবস্থা করা হবে।
ঙ. ঢাকা নগরীর পরিকল্পনাহীনতার একটি বড় কারণ আবাসিক এলাকা হিসেবে তৈরি করা অঞ্চলে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা। এর ফলে একদিকে ভবনগুলোর আকৃতি বদলে ফেলা হয়, যানবাহনের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায় এবং যানজটের সৃষ্টি হয়। আবাসিক এলাকা ও বাণিজ্যিক এলাকা, শিল্পাঞ্চল সব দেশেই পৃথক থাকে। ঢাকার আবাসিক অঞ্চলগুলোর চরিত্র ফেরত আনার উদ্যোগ নেয়া হবে, নতুন এলাকাগুলোতে কঠোরভাবে তা বজায় রাখার ব্যবস্থা করা হবে।
৫। নগরবাসীর পরিবহন
ক. গণপরিবহনের অভাবকে ঢাকা নগরীর অন্যতম প্রধান সঙ্কট হিসেবে আমরা চিহ্নিত করেছি। আমরা মনে করি, বাসযোগ্য নগরী সেটাই যেখানে গণপরিবহনের মান এত উন্নত আর আরামদায়ক থাকবে যে, স্বচ্ছল নাগরিকরাও গণপরিবহন ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ্যবোধ করবেন।
ঢাকা নগরীতে গণপরিবহনের অভাব ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাগরিকরা যেভাবে অসহায়ভাবে অপেক্ষমান থাকেন, পরস্পরকে মাড়িয়ে বাসে ওঠেন, বাদুড়ঝোলা হয়ে যাতায়াত করেন, নারী-শিশু-বৃদ্ধ-প্রতিবন্ধী যেভাবে বাসে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, ফ্যানের অভাবে আর ভাঙাচোরা সিটের কারণে কষ্ট পান, তার মাঝে শুধু সময়ের অপচয় বা শারীরিক ভোগান্তি নেই, এটা নগরবাসীর জন্য চূড়ান্ত অমর্যাদারও। অপরের প্রতি অশ্রদ্ধা এবং অহযোগিতার মনোভাবেরও বিস্তার ঘটায় গণপরিবহনের এই দুর্দশা। আমরা ঘোষণা করছি, নগর কর্তৃপক্ষ তার সম্পদের যথাসম্ভব ব্যবহার করবে নগরবাসীদের এই নৈমত্তিক অপমান থেকে মুক্ত করার জন্য। অবিলম্বে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গণপরিবহনের চাহিদা নির্ণয় করে সিটি কর্পোরেশন বিআরটিসিকে ঘাটতি সংখ্যক বাস নামাতে বলবে, অন্যথায় নগর কর্তৃপক্ষ নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে নিজস্ব তহবিল সংগ্রহ করে এই দায়িত্বটি পালন করবে।
গণপরিবহন থেকে চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ করে যুক্তিসঙ্গতবাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। গণপরিবহনের জন্য পৃথক লেন নির্ধারণ করে বাসের গতি যথাসম্ভব বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেয়া হবে।
খ. সিএনজি-ট্যাক্সি সেবা কুক্ষিগত রেখে নগরবাসীকে বিপুল পরিমাণ অন্যায় ভাড়া দিতে বাধ্য করছে কতিপয় মালিক, চালকদেরও বাধ্য করছে প্রতিদিন বিশাল অঙ্কের ‘জমা’ প্রদান করতে। এর সাথে যুক্ত বর্তমান এবং বিগত সরকারের দুর্নীতিবাজ প্রশাসন ও রাজনীতিবিদরাও। সাধারণ মানুষের এই হয়রানির অবসানের জন্য নগর কর্তৃপক্ষ যাত্রী হয়রানি বন্ধে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিএনজি-ট্যাক্সির অনুমোদন দেয়ার বন্দোবস্ত করবে এবং চালক ও যাত্রীদেরকে ভোগান্তি থেকে মুক্ত করবে।
গ. ইউরোপের বহু আধুনিক নগরে সাইকেল নতুন করে জনপ্রিয় হচ্ছে দূষণমুক্ত, স্বাস্থ্যকর এবং যানজট কমানো বাহন হিসেব। ঢাকার তরুণ-তরুণীদের মাঝেও এর জনপ্রিয়তা তৈরি হলেও দুর্ঘটনা ও উচ্চমূল্যের জন্য এর প্রসার ঘটছে না।
আমরা অঙ্গীকার করছি, প্রতিটি রাস্তায় সাইকেলের জন্য পৃথক লেনের ব্যবস্থা করবো। সাইকেল উৎসাহিত করার জন্য শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের সহজশর্তে ঋণ এবং কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে। সাইকেলকে নগর সংস্কৃতির প্রতীকে পরিণত করবো আমরা। নানান প্রতিযোগিতা ও উৎসবের আয়োজনসহ সম্ভাব্য সকল উপায় অবলম্বন করে সাইকেলকে নতুন প্রজন্মের জনপ্রিয়তম নগর বাহনে পরিণত করার জন্য আমরা সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেবো।
ঘ. ঢাকার যানজটের একটা প্রধান কারণ রাস্তায় অবৈধ পার্কিং। প্রয়োজনীয় গাড়ি রাখার ব্যবস্থা নেই এমন সকল ভবনে ও বিপনীবিতানের ওপর বাড়তি কর আরোপ করা হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে পৃথক বহুতল পার্কিং এর ব্যবস্থা করার সাপেক্ষে ব্যস্ত সড়ক থেকে সকল প্রকার পার্কিং উচ্ছেদ করা হবে। রাস্তায় গাড়ি রাখার ওপর বড় অঙ্কের জরিমানা নির্ধারণ করা হবে যাতে ভবন মালিকগণ পার্কিং ব্যবসায় উদ্যোগী হবেন। ব্যক্তিগত গাড়িকে নিরুৎসাহিত করে গণপরিবহনকে উৎসাহিত করা হবে।
৬. খাদ্যে ভেজাল ও বিষক্রিয়া রোধ
ঢাকা শহরের মানুষ একদিকে খাদ্যে ভেজালের শিকার। এ সংক্রান্ত আইনগুলোও মানার কোন বন্দোবস্ত নেই। ফরমালিন, ভেজাল উপাদান, ট্যানারি বর্জ্য দিয়ে তৈরি করা পোল্ট্রিফিডসহ মানহীন খাদ্যের কারণে নগরবাসী ভয়াবহ স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, আক্রান্ত হচ্ছেন ক্যান্সার, চর্মরোগ, পেটের পীড়া, স্নায়বিক রোগসহ অনেক অসুখে। অন্যদিকে এটা বন্ধ করার যে সরকারী বন্দোবস্ত আছে, সেটাও দুর্নীতির খপ্পরে পড়ে অকার্যকর।
খাদ্যে প্রতারণা প্রতিরোধে মহানগরীর আওতাধীন এলাকায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক তদারককারী নিয়োগ দেয়া হবে খাদ্যে ভেজাল ও বিষক্রিয়া ঠেকানোর জন্য। এই তদারককারিদের জনগণের তদারকির আওতায় আনা হবে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লা-অঞ্চলের দায়িত্বশীল নাগরিকরা পালাক্রমে এই তদারককারীদের সাথে উপস্থিত থাকবেন, নিজেরাও প্রশিক্ষিত হবেন। ভেজাল প্রতিরোধ ব্যবস্থা এর মধ্য দিয়ে যথাযথ তদারকির আওতায় আসবে; যে নাগরিকেরা ভেজালে আক্রান্ত তারা স্বয়ং নিজেরাই পাহারাদারের ভূমিকা পালন করায় এবং এই কাজে প্রশিক্ষিত হওয়ায় ভেজাল প্রতিরোধে জনশক্তিও বৃদ্ধি পাবে, দুর্নীতিও হ্রাস পাবে।
৭. স্বাস্থ্যসেবা
ঢাকা নগরীর একাটা বড় অংশের মানুষ স্বাস্থ্য সুবিধা থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত। বিশেষকরে ঢাকা উত্তরে সরকারী হাসপাতালের অনুপস্থিতি খুবই প্রকট। অন্যদিকে সরকারী উদ্যোগে হাসপাতাল না করে তাকে বেসরকারীকরণের আয়োজনই বেশি বেশি দেখা যাচ্ছে। আমরা মনে করি, নগর কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের এই গুরুতর সঙ্কটটি উপেক্ষা করতে পারে না। জনসংখ্যা অনুপাতে এবং বিশেষ করে নিম্নবিত্ত অধ্যুষিত অঞ্চলে নতুন নতুন হাসপাতাল ও পরীক্ষাগার নির্মাণ করে সাধারণ মানুষকে সুলভে স্বাস্থ্যসুবিধা প্রদান আমাদের অন্যতম করণীয় থাকবে।
৮. শিক্ষা
সিটি কর্পোরেশন এর আয়ে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত নতুন নতুন বিদ্যালয় নির্মাণে নগর কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী হবে। এখানে শিক্ষা যে সুলভে পাওয়া যাবে, তাই না, আমরা অঙ্গীকার করছি সেগুলোর পড়াশোনা-সংস্কৃতি চর্চা-সামাজিকতাবোধের মান এত ভাল হবে যে, মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তরাও সেখানে তাদের সন্তানদের পড়াতে আগ্রহী হবেন। নগর কর্তৃপক্ষ উচ্চআয়ের নাগরিকদের কাছ থেকে উচ্চক্রম হারে শিক্ষাকর আদায়ের প্রস্তাব করবে।
৯। অন্যান্য পরিষেবাগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ
নগরবাসীর দুর্ভোগের একটা বড় কারণ পরিষেবা সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ নগর কর্তৃপক্ষের হাতে নেই। এই ধারণাও এখানে চালু আছে যে, এ ক্ষেত্রে নগর কর্তৃপক্ষের কিছু করার নেই। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯ (গ) অনুচ্ছেদে ‘জনগণের কার্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত পরিকল্পনা-প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন’ এর দায়িত্ব পালনের কথা আছে। সিটি কর্পোরেশন এর কাজের তালিকাতেও পরিষেবাগুলো সরবরাহের দায়িত্ব তারই। অথচ কার্যত এগুলো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নগর কর্তৃপক্ষের আওতাধীন নয়। তাদের গাফিলতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও যখন তখন খননকাজের কারণে নাগরিকেরা দুর্দশাগ্রস্ত হন। এদের সকলকে সমন্বিত তদারকির আওতায় আনা হবে। সিটি কর্পোরেশন এই নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য নাগরিকদের মাঝে জনমত গড়ে তুলবে, প্রয়োজনে নগরবাসীর স্বার্থ রক্ষার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হবে। যে কোন পরিষেবা বিষয়ে নাগরিকদের অভিযোগ শোনার এবং ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কাঠামোগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঢাকার সুয়ারেজ ব্যবস্থার সংস্কার করা হবে। নিয়মিত মেরামত ও রক্ষাণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হবে। এমনকি বস্তিতেও প্রতিটি ঘরে ওয়াসার পাইপ লাইনের মাধ্যমে সুলভে নিরাপদ পানি পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। নির্দিষ্ট দূরত্বে এবং জনবহুল সড়কগুলোতে নিরাপদ পানি প্রাপ্তির ব্যবস্থা করা হবে। চারপাশের নদী দখল ও দূষণ মুক্ত করা হলে ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমবে, ভূপৃষ্ঠের পানি পরিশোধনের মাধ্যমেই ঘরে ঘরে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হবে। যেসকল স্থানে ওয়াসার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নেই সেসকল স্থানে পাইপ লাইন পৌঁছে দেয়া হবে। বহুস্থানে পানির লাইন ফেটে গেছে, সুয়ারেজ লাইনের সাথে মিশে গেছে। জরুরিভিত্তিতে এগুলো মেরামত ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে ওয়াসাকে বাধ্য করা হবে।
শুধু প্রধান সড়ক নয়, ঢাকা শহরের অলিগলি নিয়মিত মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বর্ষা মৌসুমে রাস্তা কাটাকাটি বন্ধ করা হবে। পানি কিংবা গ্যাস সংযোগকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা হবে যেন পানি কিংবা গ্যাসের জন্য বারবার রাস্তা কাটাকাটি করতে না হয়। ঝুলে থাকা বিদ্যুতের তারের বিপদ থেকে নগরবাসীকে রক্ষার ব্যাবস্থা করা হবে। বাসার ছাদে অব্যবহৃত স্থানে সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনে নগরবাসীকে উৎসাহিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। সরকারি ভবন স্ট্রিট লাইট সহ ব্যাপক ভিত্তিতে নবায়ণযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হবে।
১০। নগরের জন্য বিশেষ ন্যূনতম মজুরি
যে কোন মহানগরীতে বসবাসরত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সারাদেশ থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। এই কারণে ঢাকা নগরের আওতাধীনে কর্মরত সকল নাগরিকের জন্য আমরা সম্মানজনক জীবন ধারণের উপযোগী একটা ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে চাই। এখানে প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সেই মজুরি মেনে নিতে বাধ্য থাকবে।। শুধু তাই না, ঢাকাবাসীকে নানান রকম নাগরিক সেবা প্রদানকারী সরকারী সংস্থায় কর্মরতদের জন্যও দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের মত উপযুক্ত বাড়তি প্রণোদনা ভাতা নগর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রদান করার জন্য আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
১১. বস্তিবাসীদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি
নগর গবেষণা কেন্দ্রের সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী রাজধানী ঢাকায় বস্তিবাসী মানুষের সংখ্যা ৩৫ লাখ। প্রতি বর্গফুট হিসেবে বস্তিবাসীরা উচ্চমূল্য দিয়ে ভাড়া থাকলেও ভাড়াটে হিসেবে তাদের ন্যূনতম কোন অধিকার নেই- নিরাপদ আবাস, পানি, বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা তাদের জোটে না। তাদেরকে অবৈধ দখলদার হিসেবে প্রায়ই উচ্ছেদ করা হয়, হয়রানি করা হয় এবং ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বস্তিগুলোকে সিটি কর্পোরেশানের আওতায় নিয়ে সেখানে থাকার বৈধ অধিকার প্রদান করা হবে। প্রতিটি পরিবারের জন্য ন্যূনতম আকারের ঘরের ব্যবস্থা করা হবে। বস্তিগুলোতে নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে। ভাসমান মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হবে।
১২. সংস্কৃতিচর্চা ও বিনোদন
সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে ঢাকা নগরী প্রায় বদ্ধ জলাশয়ের মত। ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত উদ্যোগে কিছু কাজ এখানে থাকলেও নাগরিকদের জীবন সংস্কৃতির ছোঁয়াহীন, বিনোদনের অধিকারহীন।
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নারী-পুরুষ সকলের জন্য পরমতসহিষ্ণু, অসাম্প্রদায়িক ও সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য প্রাণবন্ত ও বৈচিত্রময় সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে আমরা গড়ে তুলতে চাই আগামীর নগরকে। এমনকি হাসপাতালের বাগান রচনায়ও যেন উদ্যান বিশেষজ্ঞ এবং শিল্পীর ভাবনার ছোঁয়া থাকে, সেভাবেই আমরা নগরকে ভাবতে চাই। নির্মাণকাজে শৈল্পিক পরিকল্পনা, সড়কের বনায়নের পরিকল্পনা, উদ্যানসহ উন্মুক্ত স্থানে ভাস্কর্য স্থাপন, নিয়মিত সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, চিত্রকলার উৎসব আয়োজন ও পৃষ্ঠপোষকতা নগর কর্তৃপক্ষের কাজের অংশ হবে। ওয়ার্ড এর বড় মাঠগুলোতে পথনাটক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার স্থান রাখা হবে। ভ্রাম্যমান পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক পরিব্রাজক দল বিদ্যালয় ও আবাসিক অঞ্চলগুলোতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। ঢাকার নদীগুলোর তীরবর্তী অঞ্চলগুলোকে দখলমুক্ত করে সেগুলোকে ভ্রমণ ও বিনোদনের অঞ্চলে পরিণত করা হবে।
এই নগরী যেন তার সাংস্কৃতিক সত্তা প্রতিনিয়ত নির্মাণ ও অনুসন্ধান করতে পারে, প্রতিটি নাগরিক যেন সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠেন তার জন্য প্রয়োজনীয় সকল উদ্যোগ নগর কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে। ছোট বড় নানান আকৃতির নতুন নতুন নাট্যশালা, সিনেপ্লেক্স, ললিতকলা কেন্দ্র, গাঠাগার, মিলনায়তন, সংগ্রহশালা গড়ে তুলে নগরের সংস্কৃতি চর্চায় নতুন প্রাণসঞ্চার করা হবে। সংগঠন ও যুথবদ্ধতাকে উৎসাহিত করা হবে। বিজ্ঞান সংগঠন, শিশু-কিশোর সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠনকে উৎসাহিত করা হবে।
১৩. স্বেচ্ছাসেবী
পৃথিবীর বহু দেশে অনেকগুলো গূরুত্বপূর্ণ সেবায় প্রধান ভূমিকা রাখেন স্বেচ্ছাসেবী তরুণ-তরুণীরা। ময়লা অপসারণ, প্রতিবন্ধীদের সড়ক পার হতে সহায়তা প্রভৃতির মত নৈমত্তিক কাজের পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ড, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মত জরুরি সময়গুলোতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে তারা গূরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আমাদের দেশে এই সুযোগটি খুবই সীমিত রাখা হয়েছে। কিন্তু সর্বদাই আমরা তরুণ ছেলেমেয়েদের ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখেছি যে কোন দুর্বিপাকে কিংবা আরও অন্যান্য স্বেচ্ছাশ্রমে। আমরা নির্বাচিত হলে উৎসাহী নারী-পুরুষদের নিয়ে এই সেবাগুলো প্রদান করার জন্য প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠন করা হবে। তাদেরকে বিশেষ সনদও প্রদান করা হবে। এর ফলে তারা যেমন দায়িত্বশীল ও সমাজের সাথে একাত্ম নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবেন, তেমনি নগর পরিচালনায় অযথা ব্যয় ও আমলাতান্ত্রিকতা হ্রাস পাবে। আমলাতান্ত্রিকতার হাতকে দুর্বল করে এভাবে নাগরিকদের অংশগ্রহণ ও তদারকি বৃদ্ধি করা হবে। বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের এই ধরনের প্রশিক্ষণে উৎসাহিত করা হবে এবং সামাজিক সেবা কার্যক্রমে যুক্ত করা হবে। স্বেচ্ছাসেবী এই তরুণ-তরুণীদের বিশেষ সনদ প্রদান করা হবে; শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক মূল্যায়নে প্রয়োজনবোধে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
১৪। জবাবদিহিতা ও নাগরিক তদারকি
সমগ্র কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। নগর কর্তৃপক্ষের ভুল, গাফিলতি ও অবহেলার কারণে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে, কোন পরিষেবায় বিঘ্ন ঘটলে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাগণ জবাবদিহিতে বাধ্য থাকবেন। আমরা নিশ্চিত, প্রতিটি ঘটনায় যথাযথ তদন্ত ও বিচার এবং যথাযথ শাস্তির দৃষ্টান্ত থাকলে নগর কর্তৃপক্ষের দোষের কারণে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি থেকে শুরু করে সেবা প্রদানে গাফিলতি, সবকিছুই হ্রাস পাবে।
প্রতিটি ওয়ার্ডে নাগরিক কমিটি গঠন ও গণশুনানির ব্যবস্থা করে সম্পদের ব্যবহার উন্নয়ন পরিকল্পনা নির্ধারণ ও তদারকি করা হবে। ইন্টারনেটে নাগরিকদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন ও দাবিদাওয়া উত্থাপন এবং মতামত প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে, নগর কর্তৃপক্ষ নিয়মিত প্রতিটি বিষয়ে উত্তর দিতে বাধ্য থাকবেন। সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে একটি হটলাইন চালু ও কল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হবে নাগরিকদের পরামর্শ ও অভিযোগ জানানোর জন্য।
১৫। নগরবাসীর মতামত সংগ্রহ ও বিশেষজ্ঞ পর্ষদ গঠন
নগরীর পরিকল্পনা গ্রহণ, উন্নয়ন কার্যক্রম ও তদারকিকে কার্যকর করার জন্য নগরবাসীর পরামর্শ নেয়ার জন্য ডাক যোগে এবং অনলাইনে পরামর্শ গ্রহণ করা হবে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি, পেশাজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে বিশেষ পর্ষদ গঠন করা হবে। উৎপাদনশীলতার বিকাশ, নগরায়ন ও স্থাপত্য পরিকল্পনা, আবাসন, পরিষেবা, আধুনিকায়নসহ সকল কিছুতে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হবে।
১৬. দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি রোধ এবং নগরকর্তৃপক্ষের আয়বৃদ্ধি
ঢাকা মহানগরীতে নাগরিক সেবার মান শুধু সম্পদের অভাবে কমে যাচ্ছে না। বরং একদিকে পরিকল্পিত দুর্নীতির মাধ্যমে এর উন্নয়ন বরাদ্দের বড় অংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ন্যায্য আয় থেকে সিটি কর্পোরেশনকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। দুটো উদাহরণ এখানেই হাজির করা সম্ভব।
ঢাকা শহরের ৪০ ভাগ মানুষের প্রধান বাহন রিকশা। ঢাকা শহরে রিকশাকে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার, এটা যেমন সত্যি, আরও বড় সত্যি হলো লক্ষ লক্ষ লাইসেন্সহীন রিকশার কাছ থেকে বছরে রিকশাপ্রতি তিন থেকে চার হাজার টাকা হিসেবে বছরে অন্তত আড়াইশ থেকে চারশ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছে সংগঠিত চাঁদাবাজরা । যতদিন না ঢাকা নগরে রিকশার চাহিদা ফুরোচ্ছে, রিকশা চালকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে, ততদিন কেন তাদেরকে লাইসেন্সের মাধ্যমে আইনী বৈধতা দিয়ে এই বিপুল আয়কে সিটি কর্পোরেশন এর তহবিলে নিয়ে আসা হবে না?
হকারদেরও নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। কিন্তু প্রায় সকল অনুন্নত দেশে সস্তা খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রীর প্রধান পসরা থাকে ফুটপাথেই। থাইল্যান্ডের ফুটপাথের খাবার বিখ্যাত, সেখানে হকাররাও নিয়ন্ত্রিতভাবে পণ্য ফেরি করেন। ঢাকায় আইনী বৈধতার অভাবে হকাররা পুলিশ ও মাস্তানদের চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে বাধ্য হন। হকারদের সংগঠনের দাবি, ঢাকার আড়াই লাখ হকার দৈনিক গড়ে ৫০ টাকা করে চাঁদা দেন। এক বছরে চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৫০ কোটি টাকারও বেশি।
চাঁদাবাজদের হাত থেকে হকার, রিকশা চালকদের রক্ষার উপায় হলো লাইসেন্স ফির বিনিময়ে তাদের আইনী বৈধতা দেয়া। সেক্ষেত্রে এই বিপুল আয় নগরকর্তৃপক্ষের হাতে আসবে, নগরবাসীর সেবা প্রদানে ব্যবহৃত হবে। অন্যদিকে হকার-রিকশাচালকদের আইনের আওতায় আনা এবং নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে, তাদেরকে নাগরিক শৃঙ্খলা মানতে বাধ্য করা যাবে।[vii]
ঢাকায় বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিকদের কাছে হোল্ডিং ট্যাক্স হিসেবে দুই সিটি করপোরেশনের পাওনা রয়েছে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। বেশি পাওনা রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের, প্রায় ১৮১ কোটি টাকা। ১০-১০-২০১২ তারিখে প্রথম আলোতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী রূপসী বাংলা হোটেলের (সাবেক হোটেল শেরাটন) কাছে পাওনা হোল্ডিং করের পরিমান ১৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এর বাজেট ২০০০ কোটি টাকা, দক্ষিণ এর ১৮০০ কোটি টাকা। সরকারী দলের এবং ক্ষমতাবান মানুষদের কাছ থেকেও বিপুল পরিমান হোল্ডিং কর বকেয়া হয়ে আছে।
সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা আদৌ না বাড়িয়ে ঢাকা নগরীতে পরিচালিত বিশালবহুল ব্যবসা, বিপনী বিতান, রেস্তোরা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর সহনীয় মাত্রায় কর আদায় করে নগরীর আয় বিপুল হারে বৃদ্ধি করা সম্ভব, সম্ভব নতুন নতুন করের ক্ষেত্র উন্মোচন করা। এভাবে সিটি কর্পোরশনকে সরকারের ওপর নির্ভরশীলতা থেকেও মুক্ত করা সম্ভব। এমনকি বাংলাদেশের সংবিধানের ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা অধ্যায়ে ‘স্থানীয় প্রয়োজনে কর আরোপ করার ক্ষমতাসহ বাজেট প্রস্তুতকরণ ও নিজস্ব তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা প্রদান’ করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
১৭। উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধির উপযোগী নগর-কাঠামো গড়ে তোলা
ঢাকার উৎপাদনসক্ষমতা বৃদ্ধি করতে না পারলে নগরবাসীর জন্য মানবিক জীবন নিশ্চিত করাও শেষ বিচারে অসম্ভব হয়ে পড়বে। কিংবা অন্যদিক দিয়ে বলা যায়, নগরবাসীর আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য পরিষেবাগুলো নিশ্চিত করার একটা অন্যতম লক্ষ্য নগরীকে উৎপাদনমুখী করা।
ঢাকা নগরী বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হলেও এর মাথাপিছু গড় উৎপাদনশীলতা যথেষ্ট নয়। এর প্রধান কারণ অবকাঠামোগত অসুবিধা। যানজট একদিকে নগরবাসীর গতিকে কমিয়ে রেখে উৎপাদনশীলতাকে স্থবির করে রেখেছে, অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তির সহজপ্রাপ্যতার অভাবও প্রকট। স্বাস্থ্যগত সমস্যাও উৎপাদনশীলতা হ্রাসের জন্য দায়ী। নগর কর্তৃপক্ষ বৃহদাকার আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে একদিকে যেমন দরিদ্র মানুষের জীবনে স্বচ্ছন্দতর করতে পারে, অন্যদিকে এটা শ্রমিক হিসেবে তার দক্ষতা বৃদ্ধিরও অত্যাবশ্যক শর্ত। সুলভে আরামদায়ক পরিবহন শুধু জীবনকে সুখী করে না, যথাসময়ে কর্মস্থলে যাবার নিশ্চয়তাও দেয়। অবকাঠামোগত সুযোগসুবিধা যৌথভাবে সুলভে নিশ্চিত করা গেলে তা সকলেরই উপকারে আসে, অন্যদিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তা করা হলে তা বিলাস কিংবা বিশেষ সুবিধায় পর্যবসিত হয়।
ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতি উদ্যোক্তাদের যেমন নিরুৎসাহিত করে, তেমনি নগরবাসীর জীবনকেও তা কষ্টসাধ্য করে তুলছে। আমরা নির্বাচিত হলে সকলের স্বার্থ অটুট রেখে ঢাকার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য যথাসম্ভব অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। এর মাঝে থাকবে শ্রমজীবীদের জন্য আবাসন প্রকল্প, পরিবহন প্রকল্প, দেশীয় শিল্পের বিকাশসাধনের উপযুক্ত প্রণোদনা, তথ্যপ্রযুক্তিগত সহায়তা, বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ অন্যান্য ব্যবস্থাপনা।
১৮। সংযোজন ও পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে পূর্ণতর অভীষ্ট নির্ধারণ
এই ইশতেহার আমরা তৈরি করেছি আামাদেরই প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। সেই কারণেই ইশতেহারের প্রস্তাবনা ও পরিচালনার মূলনীতির বিষয়ে আমরা দৃঢ় থাকলেও এর অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতিগুলোকে আরও বাস্তবসম্মত ও জীবনমুখী করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে আমরা সচেতন থাকবো। এই ইশতেহারকে পূর্ণ করে তোলা এবং তার আদর্শকে বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রাম করাকে আমরা আমাদের জীবনের ব্রত বলে ঘোষণা করছি।
আমরা এমন নগরী চাই যেখানে শিশুরা নিরাপদে বিদ্যালয়ে পৌঁছাবে, রাস্তার পাশ থেকে ছিড়ে নেবে ফল, চিনবে গাছ, তরুণ-তরুণীরা যেখানে থাকবে কর্মচঞ্চল, উৎসবমুখর এবং বন্ধুবৎসল। নারীরা যেখানে কোন ভীতি বা বাধা ছাড়াই চলাফেরা করতে পারবেন। সকল ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গের মানুষ এই নগরে সম্মান আর মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবেন। নগরীকে আপন ভাবতে শিখবেন। আমাদের স্বপ্ন- মর্যাদা আর দায়িত্বের পরিপূরক অনুভূতি নিয়ে আমরা সকলে মিলে যেন গড়ে তুলতে পারি আগামীর ঢাকা। আমরা চাই প্রতিটি নাগরিকের স্মৃতিকে ঢাকা ঘিরে রাখুক যাতে তার অস্তিত্বের মর্মমূল পর্যন্ত এই নগরীর জন্য ভালবাসা অনুভব করেন।
এই পরিবর্তন সম্ভব, আমরা এই পরিবর্তন চাই।
বাংলাদেশের মানুষ আজ যে সংকট এবং দুর্যোগের মধ্যে আছেন, এই ঢাকা শহরের মানুষের জীবন ও সম্পদ, প্রকৃতি ও প্রতিবেশ যে বিপর্যয়ের মধ্যে আছে, এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সর্বত্রই দেখছি পরিবর্তনের এক জাগরণী ডাক। মানুষ পরিবর্তন চায় এবং আমরা বিশ্বাস করি পরিবর্তন সম্ভব। সামনে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। মানুষের এই আকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য, মানুষের আকাঙ্ক্ষার সম্মিলনী ঘটানোর জন্য আমরা এ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামীর ঢাকায় সকল নাগরিকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হলে; এই শহরকে শিশু, নারী, তরুণ, প্রবীণ, অধিকাংশ খেটে খাওয়া মানুষ, সকলের করে তুলতে হলে; মানুষের জীবনকে আরও উন্নত বিকাশশীল করতে হলে; এর প্রকৃতি-প্রতিবেশকে রক্ষা করতে হলে; উৎপাদনশীল নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন নতুন কল্পনা, নতুন রাজনীতির। আমরা বিশ্বাস করি ঢাকার নাগরিকরা, বিশেষভাবে তরুণরা এই নতুন কল্পনা, নতুন রাজনীতির উদ্বোধন ঘটাতে এগিয়ে আসবেন। আজ যে সম্ভাবনা এবং সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তরুণরা এ সম্ভাবনা এবং সুযোগকে কাজে লাগাতে সর্বোচ্চ মাত্রায় সক্রিয় হবেন। শহীদের রক্তে প্রতিষ্ঠিত এ বাংলাদেশে, মুক্তিযুদ্ধের এ বাংলাদেশে, একদিকে গুম খুন, আরেকদিকে পেট্রোল বোমা সন্ত্রাস, এই বিভীষিকা আমরা চলতে দিতে পারি না। আসুন আমরা সম্মিলিতভাবে কেবল এই শহরকে নয় পুরো বাংলাদেশকে পরিবর্তন করার সংগ্রামে লিপ্ত হই। জনগণই আমাদের ভরসা। জনগণ ঐক্যবদ্ধ হলে, তরুণরা ঐক্যবদ্ধ হলে, কোনও শক্তিই তাকে দমাতে পারবে না।
নিউজবাংলাদেশ/এফই
নিউজবাংলাদেশ.কম








