আছেন কোনো জনপ্রতিনিধি? থাকলে আওয়াজ দেন, প্লিজ...
মাসখানেক আগে দুর্ভাগ্যজনক সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করেন হনুফা বেগম (৫০)। বাসাবাড়িতে কাজ করে জীবিকা অর্জন করেন। স্বামী ইস্রাফিল রিক্সাচালক। বগুড়া সদরের লতিফপুর এলাকার বাসিন্দা। বর্তমানে শ্যামপুর থানার ধোলাইপাড়ে ডিপটি গলির বস্তিতে দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে বসবাস।
বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে একটি রিকশা ভ্যান এসে থামে। ভ্যানের ওপরে সামিয়ানার মতো চাদর টানানো। তাতে শুয়ে আছেন এক নারী। মুখচোখে দাঁতচেপে ব্যথা হজম করার কষ্টকর অভিব্যক্তি।
হাসপাতালের সামনে উপস্থিত হনুফার কিশোর ছেলে সবুজ (১৫)। তার চেহারায় মায়ের চেয়ে বেশি কষ্টের ছাপ ফুটে উঠেছে। বিষয় কী- প্রশ্ন করতেই সবুজ জানায়, গ্রামের বাড়ি ছেড়ে গত ৫ মার্চ তারা ঢাকার পথে রওনা হয়। পথে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর এলাকায় তাদের বহনকারী বাসটির সঙ্গে অপর একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে হনুফার ডান পা ও পাঁজরের ৬টি হাড় ভেঙে যায়। প্রথমে টাঙ্গাইল সদর হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। সেখান থেকে ঢামেক হাসপাতালে রেফার করা হয়। চিকিৎসায় এখানে কিছুটা উন্নতির পর চিকিৎসকরা তাকে ছাড়পত্র দিয়ে বিদায় করেন।
কিন্তু এরপর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে আশপাশের ফার্মেসি থেকে ইচ্ছামতো ব্যথানাশক ওষুধ কিনে খাওয়ানো হয়। এতে অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হতে থাকে। সবশেষে আজ (বৃহস্পতিবার) হনুফার ব্যথার তীব্রতা চরমে ওঠে। কিন্তু ডাক্তার-হাসপাতাল করার পয়সা হাতে নেই। এক পর্যায়ে হনুফার বড় ভাই আব্দুল খালেক আর সবুজ রাস্তায় নামেন। প্রতিবেশী আর এলাকাবাসীর কাছে হাত পেতে হাজার পাঁচেক টাকা যোগাড় করেন। তাই নিয়ে রিকশা ভ্যানে করে হনুফাকে নিয়ে ঢামেক হাসপাতালে ছুটে আসেন তারা। উপযুক্ত চিকিৎসা চাই তাদের।
সবুজকে প্রশ্ন করি, দুর্ঘটনার পর তো পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া দরকার ছিল। সেখানে নাওনি কেন?
ভাগ্নের হয়ে জবাব দেন আব্দুল খালেক। বলেন, অভাব অনটনের সংসারের কারণে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসছিলাম উন্নতির আশায়। কাজকাম করে দুমুটো খেয়ে বাঁচার সুযোগ সন্ধানে রওনা করেছিলাম। কিন্তু পথেই ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় বোনের এই অবস্থা। অভাবের তাড়নায় ঢাকায় আসছিলাম। পেটই চালাতে পারি না, এত ব্যয়বহুল চিকিৎসা করাবো কেমনে?
তারা আরও জানান, দুর্ঘটনার পর বগুড়ায় ফিরে যাওয়ারও উপায় ছিল না। গিয়ে কী হবে? কে তাদের জন্য কাজ আর খাবার নিয়ে বসে আছে! তাই শেষমেষ কোনোমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় রাজধানীর শ্যামপুর থানার ধোলাইপাড়ে ডিপটি গলির বস্তিতে।
হনুফার স্বামী ষাটোর্ধ ইস্রাফিল জানান, বয়সের ভারে আর অসুস্থতাজনিত কারণে সবসময়ে রিকশা চালাতে পারেন না। তাই সংসারের অবস্থা ভয়াবহ। চোখে নির্বাক দৃষ্টি নিয়ে জানালেন, সন্তানদের অভুক্ত মুখ আর স্ত্রীর হাড়ভাঙ্গা কষ্ট বোবা হয়ে দেখেন। কিন্তু কী করবেন, কোথায় কার কাছে যাবেন- মাথায় কিছুই ঢোকে না।
তাদের বিষয়টি জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. আমজাদ হোসেনের নজরে আনা হয়। তিনি নিউজবাংলাদেশকে বললেন, “আমাদের এখানে যা কিছু করা সম্ভব তা আমি করে দিচ্ছি। কিন্তু পরবর্তীতে বিভাগীয় (অর্থোপেডিক) কাজগুলো সংশ্লিষ্টদের করতে হবে।”
নিউজবাংলাদেশের ঢামেক প্রতিনিধি আজিজুল হাকিম সেলফোনে ঘটনা এ পর্যন্ত বলে থেমে যান। তার গলা কিছুটা ধরে আসে। বুঝি, তিনি কিছুটা আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছেন। রিপোর্টারদের অমন হলে চলে না, আবার হয়েও যায়। কিন্তু এ ঘটনা নিয়ে কী রিপোর্ট করবো! ইন্টারপোলে তারেক রহমানের নামে রেড অ্যালার্ট ছাপিয়ে বর্ষবরণ চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বেশ কয়েকজন নারীকে প্রকাশ্যে শ্লীলতাহানি আর বস্ত্রহরণের ঘটনা এখন হট নিউজ। হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রুল জারি করেছেন। স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার, পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার, শাহবাগ থানা ওসি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। আদালত রুলে জানতে চান, এ ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
অপরদিকে, ৩ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে সারাদেশ সরগরম। এই আবহে হনুফাদের নিয়ে রিপোর্ট করলে কে পড়বে আর এগিয়ে আসবে?
এসব যখন ভাবছি, আজিজুল হাকিম তাগাদা দেন- ভাই, একটা কিছু করতে হইবো। একটু লেইখা দেন। যদি কেউ আগায়া আসে...
মোট কথা হনুফার পরিবারের আয়-রোজগার কোথায় কীভাবে হবে তার চেয়ে বড় প্রশ্ন তার সুচিকিৎসার ব্যয়ভার কে নেবে? আবেগতাড়িত হাকিম সেটাই বলছেন বারবার। বেশকিছু টাকা এখানে লাগবে। রাজধানী এখন নির্বাচনী পোস্টারে-ব্যানারে সয়লাব। টাকা তো সেখানেও ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু সেই টাকা জনপ্রতিনিধিদের, বা তাদের একনিষ্ঠ-নিঃস্বার্থ সমর্থকদের পকেট থেকে আসছে। জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়ে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেবেন। এটা অনেক গুরুতর দায়িত্ব। হনুফাদের সংসারের বোঝা টেনে তোলার দায়িত্ব কে নেবে?
কিন্তু তাদের সংসারকে টেনে না তুললেও এই মহাবিপদে হনুফার চিকিৎসার ব্যয়ভার নেওয়ার জন্য কোনও জনপ্রতিনিধি আছেন কি? কিংবা জনপ্রতিনিধি না হোক, একেবারে সাধারণ কোনো সামর্থ্যবান মানুষ? থাকলে দয়া করে আওয়াজ দেবেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম








