ট্রাম্পের ‘বিগ বিউটিফুল বিল’ পাস: ৪ জুলাই স্বাক্ষর
ছবি: সংগৃহীত
অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে চূড়ান্ত বাধা অতিক্রম করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘বিগ বিউটিফুল বিল’।
বৃহস্পতিবার (৩ জুলাই) রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে অল্প ব্যবধানে পাস হয়েছে কর হ্রাস এবং সরকারি ব্যয়ের এই বিশাল প্যাকেজটি।
এই বিলটি কংগ্রেসে পাস হওয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য একটি বিশাল বিজয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, বিশেষ করে শুক্রবার (৪ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের আগেই এটি আইনে পরিণত হওয়ার বিষয়ে তার আগ্রহ ছিল।
প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি ২১৮-২১৪ ভোটের ব্যবধানে পাস হয়। বিলটি পাস হওয়ার পর স্পিকার মাইক জনসন তাতে স্বাক্ষর করেন। রিপাবলিকানদের মধ্যেই বিলটি নিয়ে প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও, এটি পাস হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নিজ দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। দুটি রিপাবলিকান সদস্য, কেনটাকির টমাস ম্যাসি এবং পেনসিলভানিয়ার ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক বিলটির বিপক্ষে ভোট দেন। এই বিল এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে, যা সম্পন্ন হলেই এটি আইনে পরিণত হবে।
হোয়াইট হাউসের ঘোষণা অনুযায়ী, ৪ জুলাই বিকাল ৫টায় (স্থানীয় সময়) এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বিলটিতে স্বাক্ষর করবেন।
এর আগে, ১ জুলাই, মঙ্গলবার কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে বিলটি নাটকীয়ভাবে ৫১-৫০ ভোটে পাস হয়। বিলের পক্ষে ও বিপক্ষে সমান ভোট পড়ায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স 'টাই' ভেঙে বিলের পক্ষে ভোট দেন, যা বিলটির পাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিলটির বিপক্ষে ভোট দেওয়া ৪৭ জন ডেমোক্র্যাট সদস্যের সঙ্গে ৩ জন রিপাবলিকানও (টম টিলিস, র্যান্ড পল এবং সুসান কলিন্স) যোগ দিয়েছিলেন। সিনেটে পাস হওয়ার পর বিলটি প্রতিনিধি পরিষদে ফিরে আসে এবং সেখানে সেনেটের সংশোধিত সংস্করণ অনুমোদিত হয়।
প্রায় ৯০০ পৃষ্ঠার এই বিলটিতে কর হ্রাস, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ কমানো, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এটি মূলত ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদকালে দেওয়া কর ছাড়েরই সম্প্রসারিত রূপ।
আরও পড়ুন: ‘ওয়ান বিগ বিল’ নিয়ে ট্রাম্প-মাস্ক দ্বন্দ্ব চরমে
- কর হ্রাস: বিলটিতে প্রায় ৪.৫ ট্রিলিয়ন (৪.৫ লক্ষ কোটি) ডলারের কর ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালের কর ছাড়গুলো স্থায়ী করা এবং নতুন কিছু কর ছাড় যোগ করা হয়েছে, যেমন কর্মীদের টিপস এবং ওভারটাইম আয়ের ওপর কর মওকুফ এবং বার্ষিক ৭৫,০০০ ডলারের কম উপার্জনকারী বয়স্কদের জন্য ৬,০০০ ডলারের কর ছাড়। এটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য সবচেয়ে বড় কর ছাড় হিসেবে দাবি করা হচ্ছে।
- সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে কাটছাঁট: কম আয়ের মার্কিন নাগরিকদের জন্য মেডিকেইড নামের স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি এবং খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির (ফুড স্ট্যাম্পস) বাজেট থেকে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন (১.২ লক্ষ কোটি) ডলার কমানো হবে। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা লাখ লাখ আমেরিকানকে স্বাস্থ্যবিমা এবং খাদ্য সহায়তার আওতার বাইরে নিয়ে যেতে পারে। কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের অনুমান অনুযায়ী, এই বিলের ফলে আগামী ১০ বছরে ১৭ মিলিয়ন মানুষ স্বাস্থ্যবিমার বাইরে চলে যাবেন।
- সামরিক ব্যয় ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ: বিলটিতে জাতীয় নিরাপত্তা এবং ট্রাম্পের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির জন্য প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণ, অভিবাসী আটক কেন্দ্র সম্প্রসারণ, এবং ইউ.এস. ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের জন্য উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রয়েছে। এটি “গোল্ডেন ডোম” প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নেও সহায়তা করবে।
- অন্যান্য: বিলটিতে রাজ্য ও স্থানীয় করের (SALT) সীমা ১০,০০০ ডলার থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছরের জন্য ৪০,০০০ ডলার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়াও শিশু কর ক্রেডিট প্রতি শিশু প্রতি ২,০০০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২,২০০ ডলার করার কথা বলা হয়েছে। এই বিলে সবুজ শক্তি কর ক্রেডিটগুলোতে বড় ধরনের কাটছাঁটেরও প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিলটি নিয়ে ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেই প্রবল বিরোধিতা ছিল। বিশেষত, কিছু রিপাবলিকান সদস্য মেডিকেইড এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে কাটছাঁটের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ডেমোক্র্যাটরা বিলটির তীব্র বিরোধিতা করে এটিকে ধনীক শ্রেণীর জন্য কর সুবিধা এবং শ্রমজীবী ও দুর্বল আমেরিকানদের উপর চাপিয়ে দেওয়া "এক বড় কুৎসিত বিল" (Big Ugly Bill) বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ডেমোক্র্যাটিক নেতা হাকিম জেফ্রিস প্রতিনিধি পরিষদে প্রায় ৯ ঘণ্টা ধরে দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে বিলটির বিরোধিতা করেন, যা আধুনিক মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে দীর্ঘতম বক্তৃতার রেকর্ড তৈরি করে। কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই বিলটি আগামী দশ বছরে দেশের ঘাটতি প্রায় ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে দেবে।
এই বিল পাসের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের ছয় মাসের মধ্যেই একটি বড় রাজনৈতিক জয় নিশ্চিত করলেন, যা তার প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নকে নির্দেশ করে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








