‘ওয়ান বিগ বিল’ নিয়ে ট্রাম্প-মাস্ক দ্বন্দ্ব চরমে
ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও টেসলা-স্পেসএক্স প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন এখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’ ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত আক্রমণ, ভর্তুকি হুমকি এবং নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণায় রূপ নিচ্ছে।
২০২৫ সালের জুনের শেষ সপ্তাহে সিনেটে ভোটের মুখোমুখি হয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে আলোচিত ব্যয় পরিকল্পনা ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’। বিলটির মাধ্যমে কর ছাড়ের মেয়াদ বাড়ানো, সীমান্ত নিরাপত্তা, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে বড় বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বিলটি বাস্তবায়িত হলে জাতীয় ঋণ বেড়ে যাবে কমপক্ষে ৩ ট্রিলিয়ন ডলার এবং লাখ লাখ দরিদ্র আমেরিকান স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবেন।
এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করে সোমবার (৩০ জুন) স্থানীয় সময় ইলন মাস্ক তার মালিকানাধীন এক্স-এ (পূর্বে টুইটার) লিখেন, যদি এই খরচে উন্মাদনা বিল পাস হয়, তাহলে পরদিনই ‘আমেরিকা পার্টি’ গঠন করা হবে। আমাদের দেশে সত্যিকারের কণ্ঠস্বর দরকার, যা ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান দুই দলের বাইরে।
তিনি আরও লিখেন, ঋণের সীমা যদি বারবার বাড়াতে হয়, তাহলে এর কোনও অর্থই থাকে না। কংগ্রেস সদস্যরা যারা এই বিলের পক্ষে ভোট দিচ্ছেন, তাঁদের মাথা লজ্জায় নিচু করে থাকা উচিত।
মাস্কের টুইটের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করে কড়া প্রতিক্রিয়া জানান।
তিনি লিখেন, ইলন মাস্ক সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি পাওয়া ব্যক্তি। এই ভর্তুকি বন্ধ হলে তার সব ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে এবং তাকে দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরে যেতে হবে।
তিনি আরও যুক্ত করেন, আর কোনো রকেট উৎক্ষেপণ, স্যাটেলাইট বা ইভি উৎপাদন নয়—এসব বন্ধ হলে দেশের বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে। ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সিকে (DOGE) তদন্তে নামতে বলা উচিত।
আরও পড়ুন: তেলঙ্গানায় রাসায়নিক কারখানায় বিস্ফোরণে নিহত ৩৪
উল্লেখ্য, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর DOGE (Department of Government Efficiency)-এর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন মাস্ককে। তবে গত মে ২০২৫ মাসে মাস্ক পদত্যাগ করেন।
জুনের শেষ সপ্তাহে মাস্ক একাধিকবার তার ‘আমেরিকা পার্টি’ গঠনের ইঙ্গিত দেন। এক্স-এ তিনি একটি জরিপ চালান, যেখানে ৮০ শতাংশ ব্যবহারকারী একটি নতুন রাজনৈতিক দলের পক্ষে মত দেন।
মাস্ক বলেন, আমরা এখন ‘পর্কি পিগ পার্টি’-র দেশে বাস করছি। এমন একটা রাজনৈতিক দল দরকার যারা মানুষের কথা চিন্তা করে, ঋণ নয়।
তিনি আরও জানান, প্রাথমিক নির্বাচনে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যদের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়াবে, তাদের অর্থ ও প্রচার দিয়ে সহায়তা করবেন।
ট্রাম্পের অভিযোগ অনুযায়ী, মাস্কের প্রতিষ্ঠান টেসলা, স্পেসএক্স, নিউরালিঙ্ক ও সোলারসিটিকে মার্কিন সরকার এখন পর্যন্ত শত শত বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিয়েছে।
ট্রাম্প একাধিকবার বলেন, তিনি ইভি ম্যান্ডেটের (ইলেকট্রিক ভেহিকল বাধ্যতামূলক) বিরোধী এবং মাস্ক সরকার নির্ধারিত সুবিধা নিয়ে ব্যবসা করেও তার বিরোধিতা করছেন।
জবাবে মাস্ক ৩০ জুন এক্স-এ লেখেন, আমি সত্যিই বলছি—সব ভর্তুকি বন্ধ করুন, এখনই বন্ধ করুন।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রচারণায় ২৭৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করেন মাস্ক, যা তাকে রিপাবলিকানদের অন্যতম বড় আর্থিক পৃষ্ঠপোষকে পরিণত করে। ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চেও মাস্কের ‘আমেরিকা প্যাক’ নামের সুপার প্যাক দুটি বিশেষ নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী র্যান্ডি ফাইন ও জিমি পেট্রোনিস-কে অর্থ সহায়তা দেয়।
তবে মে মাসে এক সাক্ষাৎকারে মাস্ক বলেন, তিনি এখন রাজনীতিতে খরচ কমিয়ে আনতে চান।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মাস্ক ছিলেন তার ঘনিষ্ঠতম পরামর্শক ও ছায়াসঙ্গী। DOGE-এর প্রধান হিসেবে তিনি সরকারি ব্যয়ের খরচ কমানো এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর দায়িত্ব পান। কিন্তু ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’-কে কেন্দ্র করে সেই সম্পর্ক দ্রুত ভেঙে পড়ে।
২০২৫ সালের জুনে শুরু হওয়া ট্রাম্প-মাস্ক দ্বন্দ্ব কেবল দুই ব্যক্তির মধ্যকার মতবিরোধ নয়—এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যত, বাজেট নীতি, প্রযুক্তির স্বাধীনতা এবং দ্বিদলীয় শাসন ব্যবস্থার টেকসইতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। মাস্কের ‘আমেরিকা পার্টি’ যদি সত্যিই গঠিত হয়, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এক নতুন শক্তির উত্থান ঘটাতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্পও তার রাজনৈতিক ও বাজেটীয় অবস্থান ধরে রেখে মাস্কের ব্যবসায়িক অস্তিত্বের প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন—যা আগামী নির্বাচনে একটি বড় বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








