News Bangladesh

তথ্য-প্রযুক্তি ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৯:০৬, ২ এপ্রিল ২০২৬

৫৩ বছর পর নতুন চন্দ্রযুগের সূচনা, উড়ল আর্টেমিস-২

৫৩ বছর পর নতুন চন্দ্রযুগের সূচনা, উড়ল আর্টেমিস-২

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ ৫৩ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও মানুষকে নিয়ে চাঁদের পথে যাত্রা শুরু করল মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA)।

বুধবার (০১ এপ্রিল) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে নাসার বিশালাকার ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ (এসএলএস) রকেটে চড়ে মহাকাশ যাত্রা শুরু করেছেন চার নভোচারী।

১৯৭২ সালে অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর এটিই প্রথম কোনো মানববাহী মহাকাশযান যা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ ছাড়িয়ে গভীর মহাকাশের অভিমুখে রওনা হলো। ‘আর্টেমিস-২’ নামের এই ঐতিহাসিক মিশনের সফল উৎক্ষেপণ মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন যুগের সূচনা করল।

৩২ তলা উচ্চতার শক্তিশালী এই রকেটটি কমলা-সাদা রঙের ধোঁয়া ছড়িয়ে মেঘের বুক চিরে যখন আকাশে উড্ডয়ন করে, তখন কেনেডি স্পেস সেন্টারে উপস্থিত হাজার হাজার দর্শক ও নাসার কন্ট্রোল রুমে থাকা কর্মীদের মধ্যে বাঁধভাঙা উল্লাস দেখা দেয়। 

যাত্রার আগ মুহূর্তে লঞ্চ ডিরেক্টর চার্লি ব্ল্যাকওয়েল-থম্পসন নভোচারীদের উদ্দেশে এক আবেগঘন বার্তায় বলেন, আপনারা এই অভিযানে কয়েক প্রজন্মের স্বপ্ন ও বিশ্বের অগণিত মানুষের শুভকামনা বহন করছেন। এগিয়ে চলুক আর্টেমিস-২। 

উৎক্ষেপণের মাত্র পাঁচ মিনিট পরেই মহাকাশযানের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান ক্যাপসুল থেকে লক্ষ্যবস্তু দেখে জানান, তারা একটি সুন্দর চন্দ্রোদয় দেখতে পাচ্ছেন এবং সেদিকেই এগিয়ে চলেছেন।

আর্টেমিস-২ মিশনে অংশ নেওয়া চার সদস্যের এই দলটি বৈচিত্র্য ও অভিজ্ঞতার এক অনন্য সমন্বয়। মার্কিন ও কানাডীয় এই অভিযাত্রী দলে রয়েছেন কমান্ডার রিড উইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কক এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। এই মিশনের মাধ্যমে ভিক্টর গ্লোভার চাঁদের নিকটবর্তী অঞ্চলে যাওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ এবং ক্রিস্টিনা কক প্রথম নারী নভোচারী হিসেবে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন। এছাড়া জেরেমি হ্যানসেন হতে যাচ্ছেন প্রথম অ-মার্কিন নাগরিক, যিনি পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে এত দূরে পাড়ি দিচ্ছেন। 

যাত্রার আগে হ্যানসেন তার বক্তব্যে বলেন, আমরা কেবল নিজেদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির প্রতিনিধি হয়ে চাঁদে যাচ্ছি।

আরও পড়ুন: গুগলের নতুন পিক্সেল ফোনে ট্রানজিট মোড

১০ দিনের এই পরীক্ষামূলক মিশনে নভোচারীরা ওরিয়ন মহাকাশযানে চড়ে চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করবেন, তবে এই ধাপে তারা চাঁদের মাটিতে অবতরণ করবেন না। অভিযানের প্রথম দুই দিন তারা পৃথিবীর উচ্চকক্ষপথে অবস্থান করে মহাকাশযানটির জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা, জ্বালানি শক্তি এবং নেভিগেশন সিস্টেম পরীক্ষা করবেন। এরপর ‘ট্রান্সলুনার ইনজেকশন’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওরিয়ন পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে চাঁদের পথে যাত্রা করবে। মহাকাশযানটি চাঁদের পেছন দিক দিয়ে একটি ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি’ অনুসরণ করবে, যা চাঁদ ও পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ব্যবহার করে প্রাকৃতিকভাবেই যানটিকে পুনরায় পৃথিবীর দিকে ঘুরিয়ে আনবে। মিশন শেষে ক্যাপসুলটি ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার ২৩৩ কিলোমিটার বেগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে।

উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টা আগে রকেটে প্রায় ২৬ লাখ লিটার তরল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন জ্বালানি ভরার সময় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এর আগে কারিগরি জটিলতা ও হাইড্রোজেন লিকের কারণে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে কয়েকবার উৎক্ষেপণ পিছিয়ে গিয়েছিল। নাসার ইঞ্জিনিয়াররা শেষ মুহূর্তে ‘ফ্লাইট-টার্মিনেশন সিস্টেম’ এবং ওরিয়ন ক্যাপসুলের একটি ব্যাটারির তাপমাত্রা সংক্রান্ত সমস্যা দ্রুত সমাধান করায় নির্ধারিত সময়েই যাত্রা সম্ভব হয়। বোয়িং, নর্থরপ গ্রুম্যান এবং লকহিড মার্টিনের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় নির্মিত এই মহাকাশযানটি গভীর মহাকাশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার জন্য আধুনিক বিকিরণ সুরক্ষা ও স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন প্রযুক্তিতে সজ্জিত।

নাসার ‘আর্টেমিস প্রোগ্রাম’ মূলত চাঁদে মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করার একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা চাঁদের মেরু অঞ্চলে বরফ আকারে পানির অস্তিত্বের সম্ভাবনা দেখছেন, যা ভবিষ্যতে অক্সিজেন ও রকেট জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। আর্টেমিস-২ মিশনের সাফল্যের ওপরই নির্ভর করছে পরবর্তী ধাপ ‘আর্টেমিস-৩’, যার মাধ্যমে সরাসরি চাঁদের মাটিতে মানুষের অবতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। 

নাসার সায়েন্স মিশন চিফ নিকি ফক্সের মতে, নতুন প্রজন্মের কাছে এটিই তাদের ‘অ্যাপোলো’ মিশন। এই অভিযানের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো চাঁদকে একটি ‘মহাকাশ ঘাঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করে ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানব অভিযান পরিচালনার পথ সুগম করা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়