নির্বাচনী হাওয়া
প্রচারণায় ভিন্নতা: মাহী ঝাড়ুদার, আনিস দৌড়বিদ
ঢাকা: সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পালে জোড় হাওয়া লেগেছে। বেড়েছে নির্বাচনী উত্তেজনাও। প্রতীক বরাদ্দের পরই মূলত পুরোদমে প্রচারণায় নেমেছেন নির্বাচন প্রার্থীরা। ভোটারদের নজর কাড়তে প্রার্থীরা বেছে নিচ্ছেন অভিনব সব কৌশল। একেক প্রার্থী প্রচারণা চালাচ্ছেন একেকভাবে। প্রার্থীদের মতে, এই সময়ে ভোটারদের যত কাছে যাওয়া যাবে, ভোট ব্যাংকও ততই বাড়বে।
প্রতিদিনই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থীরা তাদের অভিনব প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সমর্থকদের নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন ভোটারদের ঠিক দোরগোড়ায়। এই ধারাবাহিকতায় উত্তরের মেয়র প্রার্থী বিকল্প ধারা বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী রাস্তা ঝাড়ু দিয়ে তার নির্বাচনী প্রচারণা করেন। অপরদিকে যোগ্যতা প্রমাণের জন্য দৌঁড় দেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আনিসুল হক। বস্তিতে মানুষকে জড়িয়ে ধরে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ‘কাছের মানুষ’ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন। বসে নেই অন্য প্রার্থীরাও।
দক্ষিণে আ.লীগ সমর্থিত প্রার্থী ও সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফের ছেলে সাঈদ খোকন নিজেকে তুলে ধরেছেন নগরবাসীর ছেলে হিসেবে। মামলা থাকায় বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী ও সাবেক মেয়র মির্জা আব্বাস এখনও নামতে পারেননি প্রচারণায়। তবে তার পক্ষে স্ত্রী আফরোজা আব্বাস পৌঁছে যাচ্ছেন সর্বস্তরের মানুষের কাছে। অপরদিকে সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনী ঘটা করে কোনো প্রচারণা করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। কমবেশি বাকি প্রার্থীরাও তাদের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন সাধ্যমতো।
বুধবার দুপুরে মিরপুরের কালসি মোড়ে প্রচারণা করতে গিয়ে ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিস্কারের কাজে লেগে যান সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ছেলে মাহী বি চৌধুরী। তার হাতে ঝাড়ু দেখে তার সমর্থক ও উৎসুক জনতাও এ কাজে লেগে যান। এ সময় মাহী বলেন, “আমি নির্বাচিত হলে দুর্যোগ মোকাবেলায় সিটি করপোরেশনের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হবে। কোথাও কোনো ভবন ধস বা অন্য কোনো দুর্ঘটনায় প্রাণহানি যাতে না ঘটে সে বিষয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ নগরকে একটি আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন নগর হিসেবে গড়ে তোলা হবে।” কেউ কেউ ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিস্কারের এমন প্রচারণাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রচারণার সঙ্গেও তুলনা করেছেন।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি আনিসুল হক প্রচারণায় নেমে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন দৌঁড় দিয়ে। বনশ্রীতে নির্বাচনী প্রচারণার সময় এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন ছুঁড়েছিলেন, “মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে আপনি সবচাইতে প্রবীণ। নবীনদের সঙ্গে পারবেন?” এমন প্রশ্নের উত্তর দিতেই মূলত আনিসুল হককে ‘দৌঁড়বিদ’ হয়ে দেখাতে হয়েছে। তিনিও পাল্টা বলে বসলেন, “আসুন আপনারা, আমার সাথে দৌঁড়ান। দেখুন এ বয়সেও আপনাদের সাথে পাল্লা দিতে পারি কি না!” এরপরেই সমর্থকদের নিয়ে দৌঁড় শুরু করলেন ষাটোর্ধ্ব এ মেয়র প্রার্থী। পরে তিনি বলেন, “আসলে তারুণ্য বয়সে নয়, মনে ও মগজে।”
এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়াল সবচাইতে কম বয়েসী মেয়র প্রার্থী। “আসলেই কি তিনি পারবেন” বিভিন্ন সময়ে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি তাবিথ উত্তর দিতে সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষের কাছে। উত্তর সিটির বিভিন্ন বস্তিতে টানা প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি। এ সময় বস্তিবাসীদের জড়িয়ে ধরে ভোট চাইছেন তিনি। কড়াইল বস্তিতে তাবিথকে দেখা গেছে এক শিশুকে কাঁধে চড়িয়ে প্রচারণা চালাতে। নিজেকে বস্তিবাসীর ‘কাছের মানুষ’ হিসেবে জানান দিতেই তিনি এমন কৌশল বেছে নিয়েছেন বলে তার এক সমর্থক স্বীকার করেছেন।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি প্রচারণা চালাতে গিয়ে সচেতন মানুষের দৃষ্টি কাড়ছেন সবার আগে। ধর্মীয় ঘরানার ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ইসলামী আন্দোলন সমর্থিত প্রার্থী শেখ ফজলে বারী মাসউদ। জাপা সমর্থিত প্রার্থী বাহাউদ্দিন বাবুলসহ অন্য প্রার্থীরা সকাল থেকেই যাচ্ছেন ভোটারদের কাছে। নিজের পক্ষে আদায় করে নিচ্ছেন সমর্থন।
দক্ষিণের প্রার্থীদের মধ্যে এক শুক্রবারে মসজিদে নামাজ আদায় করে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন সাঈদ খোকন। আ.লীগ সমর্থিত এ মেয়র প্রার্থী ঢাকার প্রথম মেয়র মোহাম্মদ হানিফের ছেলে হিসেবে নিজেকে নগরবাসীর ‘সন্তান’ হিসেবে সহজে পৌঁছে যাচ্ছেন সবার কাছে। সবার কাছে তিনি ‘ছেলে’ হিসেবে আবদার করেই চাইছেন ভোট।
এ সিটিতে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মির্জা আব্বাসও ঢাকার সাবেক মেয়র। তার বিরুদ্ধে মামলা থাকায় এখনও তিনি প্রকাশ্য প্রচারণায় নামেননি। তবে আব্বাসের পক্ষে তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাস চষে বেড়াচ্ছেন দক্ষিণের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। সাবেক এ মেয়র পত্নী আপন করেই কাছে টানছেন নগরবাসীকে। সরকারই মির্জা আব্বাসকে মাঠে নামতে দিচ্ছে না অভিযোগ করে এক ধরনের ‘সহানুভূতি’ও আদায় করছেন ভোটারদের কাছ থেকে।
তবে আলোচিত সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনী মেয়র পদে প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করলেও তার প্রচারণা খুব একটা চোখে পড়েনি কারও। ঘটা করে নির্বাচনী প্রচারণা করবেন না বলেও জানিয়ে দিয়েছেন রনী। তবে প্রতিনিয়ত ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ ও নির্বাচনী কৌশল নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
এ সিটিতে জাপা সমর্থিত প্রার্থী হাজী সাঈফুদ্দিন আহমেদ মিলন আগে থেকে পোস্টার লাগিয়ে সবার কাছে পরিচিতি পেয়েছেন। জাপার এ প্রেসিডিয়াম সদস্যের বাহারি রঙের পোস্টার নগরের সবখানেই সবার চোখে পড়েছে। তবে নির্বাচনকে ঘিরে গণসংযোগই বেশি চালিয়ে যাচ্ছেন মিলন। সকাল থেকে দিনভর বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটাদের সঙ্গে কথা বলা ছাড়াও পথসভা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এছাড়া অন্য প্রার্থীরাও চালিয়ে যাচ্ছেন নিজেদের প্রচারণা। স্বল্প সময়ে সর্বাধিক ভোটারদের কাছে পৌঁছার টার্গেট নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। প্রচারণায় ভিন্নতা আনতে গিয়ে কেউ কেউ লঙ্ঘন করছের নির্বাচনী আচরণবিধিও। ‘২৮ এপ্রিলের আগে যত ভোটারকে দলে ভেড়ানো যাবে, ততই লাভ’ বলেই মনে করছেন প্রার্থীরা।
নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, ভোট গ্রহণের ২১ দিন আগে প্রার্থীরা তাদের প্রচারণা শুরু করতে পারবেন। ভোট গ্রহণের ৩২ ঘণ্টা আগে সব ধরনের প্রচারণা চালানো বন্ধ করতে হবে। তবে এবারের সিটি নির্বাচনে মিছিল নিয়ে ভোট চাওয়া ও সন্ধ্যার পরে সব ধরনের প্রচারণা করতে নিষেধ করেছে নির্বাচন কমিশন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/এমএ/এফই
নিউজবাংলাদেশ.কম








