ফাঁসির আগে বিমর্ষ ছিলেন কামারুজ্জামান
ঢাকা: একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ফাঁসির আগে বেশ বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন। মৃত্যুভয়ে বিচলিত জামায়াতের এ নেতার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোয়নি। একদম চুপচাপ হয়ে পড়া কামারুজ্জামান কেবল ফ্যালফ্যাল তাকিয়েছেন চারপাশে। তবে মৃত্যুর আগে তার শারীরিক অবস্থা ছিল স্বাভাবিক।
কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, চিকিৎসক, তওবা পড়াতে আসা ইমাম ও ফাঁসির মঞ্চ পাহারায় থাকা কারারক্ষির সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে এমন তথ্য। ফাঁসির আগে কামারুজ্জামান কেমন ছিলেন- সে বিষয়ে জানা গেছে অনেক কিছু।
জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী ফাঁসির আগে আসামিকে গোসল করানো হয়। কামারুজ্জামানকেও গোসল করাতে আসেন দায়িত্বে নিয়োজিতরা। কিন্তু কামারুজ্জামান প্রথমে গোসল করতে চাননি। পরে অবশ্য নিজে থেকেই গোসল সেরেছেন।
ফাঁসির মঞ্চে নেয়ার ঘণ্টাখানেক আগে কারা মসজিদের ইমাম মাওলানা মনির হোসেন তওবা পড়াতে যান যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানকে। তখন তিনি বেশ ভেঙে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন ইমাম। নিউজবাংলাদেশকে তিনি বলেন, “মৃত্যুর খবর তো তিনি পেয়েই গেছেন। এ সময় নিজেকে ঠিক রাখা কঠিন। তবে তিনি ভেঙে পড়েছেন, সেটা ভালোভাবেই বোঝা গেছে।”
তিনি আরো বলেন, “আমার সঙ্গেই তিনি বিভিন্ন দোয়া পড়েন। তওবা করেন। তবে কোনো কথা বলেননি। পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মতো সময় আমি তার কাছে ছিলাম। কয়েকবার আমার দিকে তাকিয়েছেন কামারুজ্জামান।”
একটি সূত্র জানায়, বিকেলে কারাগারে কামারুজ্জামানের স্বজনরা দেখা করে যাওয়ার পর থেকে আর কোনো কথা বলেননি তিনি। বিভিন্ন কারণে এ সময় কনডেম সেলে বারবার কারাগারে দায়িত্বরতদের যেতে হয়েছে। কিন্তু কামারুজ্জামান চুপচাপ বসে ছিলেন। তিনি কারও সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।
তওবা পড়ানোর পরে জামায়াতের এ নেতা নামাজ পড়তে চান। সে সুযোগ পেয়ে বেশ কয়েক রাকাত নামাজ পড়েন তিনি। মোনাজাতে জোরে শব্দ করে কোনো কান্না করেননি তিনি। তবে অনেক সময় ধরে মোনাজাত করেছেন।
এদিকে কামারুজ্জামানের স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল বলে জানান ডেপুটি সিভিল সার্জন আহসান হাবীব। ফাঁসির পরে রাতে তার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তখন তিনি বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী আমরা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছি। অস্বাভাবিক কিছু দেখিনি। প্রেসার থেকে শুরু করে সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল।”
মৃত্যুর খবর পেয়ে তার মন বিচলিত হয়ে পড়েছে বলেও দাবি করেন এ চিকিৎসক। তিনি বলেন, “এটাতো খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার যে, কারও মৃত্যু খবর এলেই সে বিচলিত হয়ে পড়বে। মৃত্যুকে সবাই ভয় পায়। সে ছাপ অবশ্য তার চোখে-মুখে পাওয়া গেছে।”
সন্ধ্যার পরে কামারুজ্জামানের কাছে খাবার পাঠানো হয়। তিনি মুরগির মাংস ও ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খেয়েছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে প্রতিদিনের চাইতে তার খাবার গ্রহণের পরিমাণ কম ছিল। খেতে অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি সময় নিয়েছেন বলেও জানা যায়।
ফাঁসির মঞ্চে নেয়ার সময় কামারুজ্জামান একবার পড়ে যান বলে জানা যায়। তাৎক্ষণিকভাবে তার স্বাস্থ্য আবারও পরীক্ষা করা হয়। সবকিছু ঠিকঠাক আছে নিশ্চিত হওয়ার পরেই রাত সাড়ে ১০টায় ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হয় এ যুদ্ধাপরাধীকে।
এসময় ফাঁসি মঞ্চের পাশে ১২ জন অস্ত্রধারী কারারক্ষি ছিলেন। অস্ত্রধারী আর কোনো বাহিনীর সদস্যরা কারাগারের ভেতরে ছিলেন না বলে জানা গেছে। তবে বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন। ছিলেন জেলা প্রশাসন ও কারাগারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরাও।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মোট আটটি কনডেম সেল রয়েছে। এর মধ্যে কামারুজ্জামানকে রাখা হয় আট নম্বর সেলে। কেবল একজন মানুষ থাকতে পারে এমন সেলে মৃত্যুণ্ডাদেশ প্রাপ্তদেরই রাখা হয়। এ সেল ছেড়ে বাইরে বের হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না তাদের। এটাস্ট বাথরুমসহ এ রুমে একটি বাতি ছাড়া আর কিছু নেই। টেবিল ফ্যানটিও দেয়া হয় গ্রিলের ওপাশ থেকে।
জানা যায়, ফাঁসির কয়েক মিনিট আগে কামারুজ্জামানকে ফাঁসি মঞ্চে আনা হয়। কনডেম সেলেই তার মাথায় পরিয়ে দেয়া হয় যমটুপি। দুইজন জল্লাদ দুই হাত ধরে তাকে নিয়ে আসেন মঞ্চের দিকে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে একটু থমকেও যান কামারুজ্জামান। তার হাত বেঁধে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয় ফাঁসি দেয়ার স্থানে। এ সময় কামারুজ্জামান ছিলেন একবারে চুপচাপ, নীরব।
এ সময় ফাঁসির মঞ্চ ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিলেন অস্ত্রে সজ্জিত ১২ জন কারারক্ষি। প্রস্তুত ছিলেন প্রধান জল্লাদ রাজু। রাত সাড়ে ১০টায় কারা কর্তৃপক্ষ লাল রুমাল দিয়ে ফাঁসি কার্যকর করার আদেশ দেন। এসময় রাজু লিভারে (ফাঁসির দড়ির সঙ্গে সংযুক্ত বিশেষ হাতল) টান দেন। মুহূর্তেই কামারুজ্জামানের পায়ের নিচ থেকে সরে যায় কাঠের পাটাতন। গলায় আটকে পড়া দড়িসহ তিনি চলে যান ভেতরে। কিছুক্ষণ দড়িটা নড়াচড়া করে পরে থেমে যায় বলে জানান ওই সময় দায়িত্ব পালন করা এক কারারক্ষি।
তিনি বলেন, “এই প্রথম আমি কারও ফাঁসি দিতে দেখেছি। কামারুজ্জামানকে কনডেম সেল থেকে যমটুপি পরিয়ে আনা হয়েছে। একবার মনে হয়েছে তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছে না। অনেকটা টেনে তাকে আনা হয়েছে। ফাঁসির মঞ্চে তুলে তার হাত বেঁধে দেয়া হয়েছে। সেল থেকে ফাঁসির মঞ্চের দূরত্ব ২০ গজ। তাকে সেল থেকে নিয়ে এসে ফাঁসি কার্যকর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়েছে।”
ফাঁসির পরে প্রায় ২০ মিনিট দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা হয় কামারুজ্জামানকে। পরে নির্দিষ্ট জায়গা দিয়ে বের করে আনা হয় মৃতদেহ। সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি শেষে কফিনে ভরে তোলা হয় ‘রনক’ নামে একটি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে।
রাত পৌনে ১টার দিকে কারাগারের সহকারী মহা পরিদর্শক আব্দুল জলিলের সঙ্গে তার বাসার সামনে কথা হয়। ওই সময় তিনি নিউজবাংলাদেশকে বলেন, “ফাঁসির আগে একটা মানুষ কেমন থাকে, এটাতো বুঝতেই পারছেন। তবে আমরা সব প্রক্রিয়া নিয়মতান্ত্রিকভাবে সমাপ্ত করেছি। তার মৃতদেহ শেরপুরে দাফন হচ্ছে। আমাদের দায়িত্ব শেষ।”
রাতে কামারুজ্জামানের ছেলে হাসান ইকবালের সঙ্গে মোবাইলে ফোনে কথা হলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার কণ্ঠ ছিল স্বাভাবিক। তিনি বলেন, “আমাদের সঙ্গে এটা অন্যায় করা হয়েছে।” তবে এরপর তিনি মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/এমএ/এফএ
নিউজবাংলাদেশ.কম








