রাজনৈতিক টানাপড়েন
এবার নববর্ষ উদযাপনে লোক সমাগম কম
ঢাকা: বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বিভিন্ন উৎসব, পালা-পার্বণ ও অনুষ্ঠান। এসবের মধ্যে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বৈশাখী মেলার আয়োজন বাঙালির একটি শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য। বিভিন্ন দেশ ও জাতির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের বর্ষবরণের ইতিহাস। তেমনি বাঙালির নববর্ষ উদযাপনেও স্বকীয়তা আছে। তা হলো, পুরনো জীর্ণতাকে ধুয়ে-মুছে সুন্দর আগামীর প্রত্যাশা।
প্রতিবছর দেশের সবচেয়ে বড় এ অনুষ্ঠান রমনাসহ আশেপাশের এলাকায় হওয়ার ফলে ভিড়ের কারণে হাঁটা দায় হয়ে পড়ে। কিন্তু এ বছর ব্যতিক্রম দেখা গেছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ বছর বৈশাখ উদযাপনে মানুষের উপস্থিতি অগের বছরগুলোর চেয়ে কম। আগে বেলা বাড়ার সাথে সাথে মানুষের উপস্থিতিও বাড়তে দেখা যেত। কিন্তু এবছর সে তুলনায় মানুষের সমাগম কম।
স্বাগত ১৪২২, বিদায় ১৪২১। নতুন বছরকে সাদরে গ্রহণ ও পুরনোকে বিদায় জানানোর মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে পয়লা বৈশাখ। বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি ও গর্বিত ঐতিহ্যের রূপময় ছটায় উদ্ভাসিত সর্বজনীন উৎসবের দিন আজ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষ আজ একাত্ম হয়ে গাইছে- ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।’
এদিকে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীরা নববর্ষকে বেছে নিয়েছেন নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার উপলক্ষ হিসেবে।
রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা তাদের পক্ষে লিফলেট বিতরণ করছেন। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী সাঈদ খোকনকে দুপুর ১টার দিকে দেখা গেল মৎস্যভবন এলাকায়। তিনি নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে পালাগানের আয়োজন করেছেন।
গত কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে ছাপিয়ে আজ প্রাণের মেলায় হাজির লাখো মানুষ। তবু যেন কোথায় এক অস্বস্তি, ভয় ও আশঙ্কা কাজ করছে মানুষের মধ্যে। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকায় রাস্তায় কোনো ধরনের প্রোগ্রাম করতে পারেনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। বড় ধরনের কোনো অনুষ্ঠানও বসেনি।
শুধুমাত্র শিল্পকলা একাডেমী শিশু-কিশোরদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সকাল সাড়ে ৮টার সময় বিভিন্ন খেলা দিয়ে শুরু হয় এ আয়োজন। চলে নাচ-গানের অনুষ্ঠান। আয়োজন করা হয় ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দুটি সংগঠন কবিতা আবৃত্তির আয়োজন করলেও নেই তেমন কোনো লোক সমাগম। চারুকলায়ও যেন আগের মতো জৌলুশ নেই। তারা শিশুদের জন্য পুতুল নাচের আয়োজন করেছে।
ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন গানের আয়োজন করা হলেও তা ক্ষুদ্র পরিসরে। সেখানে কিছু লোক সমাগম থাকলেও তা তুলনামূলক কম।
বরিশাল থেকে বৈশাখের অনুষ্ঠানে আসা দেলোয়ার হোসেন বলেন, শুনেছি ঢাকায় টিএসসিসহ বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কিন্তু এখন তা দেখতে পাচ্ছি না। শুধুমাত্র রমনা পার্কে অনুষ্ঠান হচ্ছে।
তবে বিভিন্ন স্থানে বসেছে বৈশাখীমেলা। পটুয়া আর মৃৎশিল্পীরা মেলায় নিয়ে আসছেন তাদের সৃজন সম্ভার। নাগরদোলায় চড়া আর খেলনা, পুতুল, বাঁশিসহ বৈশাখীমেলার রকমারি পণ্য কেনার দুর্নিবার আকর্ষণে ছেলে-বুড়ো আজ মেলামুখো। আশপাশে তাকালে দেখা যাবে পোশাকেও রয়েছে বাঙালিয়ানার ছাপ। নারীরা আজ পরেছেন নানা রঙের, বিশেষ করে লাল পেড়ে সাদা শাড়ি। কেউ কেউ খোঁপা বা বেণীতে গুঁজেছেন নানা রঙের ফুল। হাতে পরেছেন রেশমী চুড়ি, যার রিনিঝিনি শব্দে সচকিত হয়ে ওঠে প্রতিবেশ। তাদের কানে দুলে উঠছে দুল। ছেলেরা পরেছেন পাজামা-পাঞ্জাবি, ফতুয়া। কেউ কেউ আবার পরেছেন ধুতিও। বাঙালির ঘরে ঘরে নানা আচার-আয়োজনে, খাবারে আজ থাকবে নববর্ষের ছোঁয়া।
পথে পথে হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে হাওয়াই মিঠাই, রঙিন বেলুন, কাঠের পুতুল, মাটির পুতুল, জিলাপি, খৈ-বাতাসা, ঘরগেরস্থালীর দরকারি জিনিসসহ নানা সামগ্রী।
মোগল সম্রাট আকবরের নির্দেশে তার সভাসদ আমির ফতেহউল্লাহ খান সিরাজী প্রায় ৪০০ বছরেরও আগে হিজরি সনের সঙ্গে মিল রেখে ফসলী সন হিসেবে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের প্রচলন করেছিলেন।
মলিন টিএসসি
বর্তমান সময়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ইতিহাসের সঙ্গে টিএসসি একটি বড় অংশ জুড়ে থাকলেও এ বছরে নেই তার জৌলুস। এই টিএসসিকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন নানা আয়োজন করলেও এ বছর নেই কোনো আয়োজন। শুধু কিছু খেলনা সামগ্রীর দোকান ছাড়া বিশেষ কিছুই নেই। কিছু ছেলে-মেয়েকে বসে বসে সময় কাটাতে দেখা গেছে।
মিরপুর থেকে আসা নাসরিন জানান, টিএসসিতে আগে অনেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও এ বছর কোনো আয়োজন নেই দেখে খারাপ লাগছে।
রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট বর্ষবরণের জন্য আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপভোগ করতে সকাল থেকেই দলে দলে মানুষ আসতে শুরু করে। রমনা পার্কে স্থাপিত পুলিশ কন্ট্রোল রুম সূত্র জানায়, রমনা পার্ক, দোয়েল চত্বর, বকশি বাজার, হাই কোর্ট এলাকা, প্রেস ক্লাব, মৎস্য ভবন, কাঁটাবন, নীলক্ষেত, পলাশী ক্রসিং, পরিবাগ ও কাকরাইলসহ মোট ১৭টি পয়েন্টে দিয়ে দর্শনার্থীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেছে। তবে আগের তুলনায় এ বছর লোক সমাগম কম, প্রায় এক তৃতীয়াংশ।
নিউজবাংলাদেশ.কম/টিআইএস/এফই
নিউজবাংলাদেশ.কম








