শান্তি-মানবতা-অধিকারের শ্লোগানে বর্ষবরণ
ঢাকা: পুরোনো বছরের অন্ধকার কাটিয়ে জ্বলে উঠল নতুন এক সূর্য। পুবাকাশের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল বাঙালির হৃদয়। গাছে গাছে পাখির ডাক আর নতুন পাতায় সতেজ ডালপালা যেন বলছে এসো হে বৈশাখ এসো এসো। সত্যিই তাই, আজ মঙ্গলবার বাংলা নববর্ষ, পয়লা বৈশাখ ১৪২২। পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন বর্ষকে বরণ করছে কোটি কোটি বাংলা ভাষাভাষী। আর বর্ষবরণের কথা এলেই চলে আসে ঢাকার রমনার বটমূলে ছায়ানটের আয়োজন।
নতুন বছরের প্রথম প্রহরে রাজধানীবাসী পায়ে হেঁটে রমনার বটমূলে আসতে শুরু করে। মেয়েরা বৈশাখী শাড়ি, রঙিন চুড়ি, পায়ে আলতা লগিয়ে আর ছেলেরা পায়জামা-পাঞ্জাবি, ফতুয়া, ধুতি পরে; কেউবা মাথায় গামছা বেধে আসছে। হরেক রকমের পোশাকে বটমূলে জড় হচ্ছে তরুণ-তরুণী, মধ্য বয়সী ও বয়স্ক বাঙালিরা। অনেকের সঙ্গে ছোট্ট সোনামনিদেরও বাহারি সাজে আসতে দেখা গেছে। ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশে অবস্থানরত ভিনদেশি অতিথিরাও। তারাও এসেছে বাঙালির পোশাকে রমনার বটমূলে। আজ সবাই যেন বাঙালি।
ষাটের দশকে পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর হয়ে ওঠে। এর প্রতিবাদে ছায়ানট বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শুরু করে। এরই অংশ হিসেবে রমনার বটমূলে বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু করেছিল সংগঠনটি। সেই থেকে পয়লা বৈশাখের উৎসব আর বর্ষবরণের মূল অনুষ্ঠান মানেই রমনার বটমূল। বাঙালীর ঐতিহ্য ধারণ করে নতুন বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ১৪০৮ বাংলা বর্ষে (২০০১ সালে) বোমা হামলায় প্রাণও দিতে হয়েছে অনেককে।
সকাল সোয়া ৬টা থেকে শুরু হয় এ অনুষ্ঠান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকনির্দেশনা মেনে দলে দলে মানুষ একত্রিত হন রমনার বটমূলে। মানুষ, সমাজ ও সংস্কৃতি তথা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রাধান্য দেওয়া হয় ছায়ানটের এই সাংস্কৃতিক আয়োজনে। এবার ‘শান্তি, মানবতা, মানুষের অধিকার’ শিরোনামে আয়োজন করা হয় এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। ‘ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর প্রভাত অম্বর মাঝে’ এই রবীন্দ্র সংগীত দিয়ে শুরু হয় এবারের ছায়ানটের আয়োজন। এতে অংশগ্রহণ করেন সংগঠনটির ছোট-বড় ১২৫ জন শিল্পী। অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১০টি, কাজী নজরুল ইসলামের সাতটিসহ মোট ৩০টি গান পরিবেশন করবে ছায়ানটের শিল্পীরা। শিল্পীদের মধ্যে গান পরিবেশন করছেন- এবাদুল হক সৈকত, লাইসা আহমদ লিসা, ফারহানা আক্তার শ্যালি, খায়রুল আনাম শাকিল, তানিয়া মান্নান, আব্দুস সবুর খান চৌধুরী, মিতা হক, নাসিমা শাহিন ফ্যান্সি, মো. সিফায়েত উল্লাহ্ মুকুল, মাহমুদুল হাসান, মোহিত খান, বিজনচন্দ্র মিস্ত্রী, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, চন্দনা মজুমদার, লিয়াকত খান, সুকান্ত চক্রবর্তী, সনজীদা খাতুন।
দিনের আলো যত বাড়ছে, বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে লোক সমাগমে ততই মুখর হয়ে উঠছে রমনার বটমূল। ভোর সাড়ে ৫টার মধ্যেই অনুষ্ঠান মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন শিল্পীরা। এরই মধ্যে মঞ্চের সামনের বসার স্থান ভরে ওঠে। সকাল সোয়া ৬টায় এবাদুল হক সৈকতের সেতার বাদনের সুরে আলাপ-জোড়, রাগ পারমেশ্বরী দিয়ে মূল অনুষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। এরপরই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ’ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর’ গানটি সম্মেলকভাবে গেয়ে ওঠে শিল্পীরা। অনুষ্ঠানস্থলের প্রবেশ পথে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মেট্টপলিটন পুলিশ ও র্যাব-৩। রমনা পার্কের বাহিরে ও ভেতরে সবকয়টি প্রবেশ পথে দেহ তল্লাশি করে দর্শনার্থীদের প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে। এ জন্য মূল প্রবেশ পথগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এছাড়া আবজারভেশন টাওয়ার ও ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে রমনা পার্কের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে। এছাড়া নাগরিকদের স্বাস্থ্য সেবা দিতে র্যাব ও পুলিশ আলাদা আলাদা চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করেছে। এতে রয়েছেন অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের দল।
সকাল ৭ টায় অনুষ্ঠানস্থলের পাশে স্থাপন করা র্যাব-৩-এর কট্রোল রুমে পৌঁছান র্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ ও র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান। এ সময় ওই এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন তারা।
সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বেনজির আহমেদ নিউজবাংলাদেশকে জানান, নাগরিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে তল্লাশি চৌকি বসিয়েছে। অন্যবারের চাইতে এ বছর আরও আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে র্যাব, পুলিশ, সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছে। এছাড়া সারাদেশের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে বলে জানতে পেরেছি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মঙ্গলবার ভোর ৫টা থেকে বাংলামটর, পুরাতন এলিফ্যান্ট রোড, টেলিযোগাযোগ ভবন ক্রসিং, শাহবাগ-মৎস্য ভবন, কদম ফোয়ারা, হাইকোর্ট ক্রসিং, হোটেল রূপসী বাংলা ক্রসিং-মিন্টো রোড-বেইলি রোড-হেয়ার রোড-কাকরাইল মসজিদ ও চার্চ ক্রসিং, নীলক্ষেত-টিএসসি ক্রসিং, পলাশী মোড়-শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর ক্রসিং এবং বকশীবাজার থেকে জগন্নাথ হল প্রর্যন্ত রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যা বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকায় বৃষ্টি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। রৌদ্রজ্জ্বল দিনই থাকবে আজ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়বে বলেও আবহাওয়া দফতর তথ্য প্রচার করেছে।
নিউজাবাংলাদেশ.কম/জেএস/এফই
নিউজবাংলাদেশ.কম








