প্রিয় এদোয়ার্দো গালিয়ানো
প্রিয় এদোয়ার্দো গালিয়ানো, একটু আগেই আপনার মৃত্যু সংবাদ পেয়েছি। ১৩ এপ্রিল ৭৪ বছর বয়সে আপনার মাতৃভূমি উরুগুয়েতে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আপনি ছিলেন ল্যাটিন আমেরিকার জন্য নিবেদিত প্রাণ এক মানুষ যিনি ল্যাটিন আমেরিকার "অপহৃত স্মৃতিকে" উদ্ধার করেছেন তার লেখনির মাধ্যমে। আপনি আপনার বয়ানের মধ্যে দিয়ে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন।
ল্যাটিন আমেরিকা প্রিয় নারীর মতোই আপনার কানে কানে ফিস ফিস করে বলেছিল তার গোপন কথা- তার প্রেম ও নিপীড়িত হওয়ার গল্প। আপনি লিখেছিলেন "মেমরিজ অব ফায়ার"- উপনিবেশ পূর্ব সময় থেকে শুরু করে আধুনিক সময়ের ল্যাটিন আমেরিকার বয়ান, "ডেইজ এন্ড নাইটস অব লাভ এন্ড ওয়ার"- আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের সামরিক স্বৈরতন্ত্রের ক্ষুরধার সমালোচনা সহ আরো বহু বই। তবে আপনার সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ বোধ হয় "ওপেন ভেইনস অব ল্যাটিন আমেরিকা"- যে বইটি আপনি লিখেছিলেন ১৯৭০ এর শেষের দিকে, আপনার মাতৃভূমি উরুগুয়ে যখন গুম খুন আর দমন-পীড়নের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। একই সাথে ধারালো যুক্তি ও মহাকাব্যিক আবেগে খুব পরিস্কার করে তুলে এনেছিলেন পুজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের অধীনে ল্যাটিন আমেরিকার ৫০০ বছরের অনুন্নয়নের ইতিহাস। আপনি দেখিয়েছেন কেমন করে বিদেশী বহুজাতিক ল্যাটিন আমেরিকাকে নি:স্ব করে বিপুল মুনফা লুটে নিয়েছে, কেমন করে স্থানীয় পুজিপতিরা বিদেশীদের দালালি করে, তাদের অধিনস্ত থেকে নিজেদের বিকাশ করেছে ল্যাটিন আমেরিকার বিনাশের মাধ্যমে।
আপনার সেই বইয়ের মুখ বন্ধে ইসাবেল আলেন্দে আমাদের জানিয়েছেন, আপনি ল্যাটিন আমেরিকার পথে পথে হেটেছেন, দরিদ্র ও শোষিতদের সাথে কথা বলেছেন। কথা বলেছেন আদিবাসী ইন্ডিয়ান, কৃষক, গেরিলা যোদ্ধা, সৈনিক, শিল্পী, নায়ক, দস্যু আর পতিতাদের সাথে। আপনি জ্বরে ভুগেছেন, জঙ্গলে জঙ্গলে হেটেছেন, নিপীড়ক রাষ্ট্র আর সন্ত্রাসী বাহিনীর তাড়া খেয়েছেন। সামরিক স্বৈরাশাসকদের বিরোধীতা করেছেন, সব ধরণের শোষণ নিপীড়নের প্রতিবাদ করেছেন, মানবাধিকার রক্ষায় অকল্পনীয় ঝুকি নিয়েছেন ব্যাক্তিগত জীবনে। গোটা ল্যাটিন আমেরিকাকে আপনার চেয়ে ভালো করে আর কেউ বুঝতো কিনা জানিনা। আপনার ’ওপেন ভেইনস অব ল্যাটিন আমেরিকা’ পড়ে আমরা শুধু ল্যাটিন আমেরিকাকেই জেনেছি বুঝেছি তাই না, সা¤্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের থাবার নীচে থাকা নিজেদের দিকেও নতুন করে তাকিয়েছি, নতুন ভাবে উপলব্ধি করেছি।
প্রিয় এদোয়ার্দো গালিয়ানো, আপনি নিশ্চয়ই বুঝতেন, কেন আপনার মতো লেখকের কথা বাংলাদেশের মতো দেশের মানুষের কাছে পৌছায় না। ওপেন ভেইনস অব ল্যাটিন আমেরিকা পড়ার পর যখন সিদ্ধান্ত নেই আপনার সব বই পড়তে হবে, জোগাড় করতে পারি নি, বইয়ের দোকানগুলোতে অগ্রিম জমা দিয়ে অর্ডার দিয়েও আনানো যায় নি। আপনি লিখেছিলেন- "আমরা এমন এক দুনিয়ায় বসবাস করি যেখানে জীবিতদের তুলনায় মৃতদের মূল্য বেশি।" এটা সারা দুনিয়ার মতো বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
আপনাকে হয়তো নোবেল দেয়া হয়নি, তবে আমরা জানি, আপনি জীবিত থাকা অবস্থাতেই, শুধু ল্যাটিন আমেরিকায়ই নয়, সারা দুনিয়াব্যাপি গণমানুষের স্বপক্ষের এক আবেগি ও ক্ষুরধার ভাষার লেখক হিসেবে ব্যাপক পরিচিত পেয়েছিলেন। আমরা আশাকরি, সারা দুনিয়ার নিপীড়তের স্বপক্ষের মানুষেরা আপনাকে আরো ভালো করে জানা ও সেই অনুযায়ী দুনিয়াটা পাল্টানোর লড়াইটাকে আরো তীব্র করে তুলবে। লড়াই ছাড়া তো বাচার আর কোন উপায় নেই। আপনি নিজেই তো বলেছিলেন- "যা ছাড়া দুনিয়াতে বেচে থাকা অর্থহীন, তার জন্য লড়াই করে মরাই তো অর্থময়"।
আপনার কথা দিয়েই শেষ করি- "জীবন বৃক্ষ তো জানে, যতকিছুই ঘটুক না কেন, তার চারপাশে পাক খেতে থাকা সঙ্গীতের উষ্ণতা কোনদিন থেমে যাবে না। যত মৃত্যু আসুক, যত রক্তপাত ঘটুক, এই সঙ্গীত নরনারীদের নাচিয়েই যাবে যতক্ষণ বাতাস তাদের নি:শ্বাসে থাকে আর জমি তাদের চাষ করে ও ভালোবাসে।"
নিউজবাংলাদেশ.কম/এসজে
নিউজবাংলাদেশ.কম








