হরমুজ প্রণালিতে ‘নিঃশর্ত ও অবাধ চলাচল’ এখন কেবলই অলীক কল্পনা: ইরান
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে রণকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ ঘোষণা করে ‘কঠোর নিয়ন্ত্রণে’ নেওয়ার দাবি করেছে ইরান।
তেহরানের দাবি, মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল থাকা অবস্থায় এই আন্তর্জাতিক জলসীমায় ‘নিঃশর্ত ও অবাধ চলাচল’ এখন কেবলই অলীক কল্পনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতির কারণে এই ধারণা এখন কার্যত অচল। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দেশটি এবং উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে প্রণালিটি বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনা ও অবরোধ ইস্যুতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অবস্থান পরিবর্তন করল ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
রবিবার (১৯ এপ্রিল) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ও এএফপি’র প্রতিবেদনে ইরানের এই কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক বিবৃতিতে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে তা রুখতে আন্তর্জাতিক আইনের কোনো বিধিই উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে ইরানকে বাধা দিতে পারবে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কাল্লাসের ‘প্রণালিতে অবাধ ও টোলমুক্ত’ চলাচলের আহ্বানের জবাবে বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতির মুখে ‘নিঃশর্ত ট্রানজিট’ ধারণা এখন একটি মৃত কল্পকাহিনী মাত্র এবং তা এখন কেবল তাত্ত্বিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ।
এমন বক্তব্যের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি ঘিরে বাস্তব পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে দেখা যাচ্ছে। একদিকে ইরান সাময়িকভাবে প্রণালিটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দিলেও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আবার কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নৌবাহিনী ঘোষণা দেয়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকবে। শুধু তাই নয়, এই পথ ব্যবহার করে চলাচলের চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়।
আরও পড়ুন: হরমুজে ৩ ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে ‘ইরানি গানবোট থেকে গুলি’
আইআরজিসির বিবৃতিতে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে অবস্থানরত জাহাজগুলোকে নোঙর না তুলতে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং হরমুজমুখী যেকোনো অগ্রসরতা ‘শত্রুর সঙ্গে সহযোগিতা’ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে জানানো হয়। এদিকে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, ইরানি গানবোট থেকে বাণিজ্যিক জাহাজের দিকে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
ভারতের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, তাদের পতাকাবাহী দুটি জাহাজ একই ধরনের হামলার মুখে পড়েছে এবং কয়েকটি জাহাজ আইআরজিসির পক্ষ থেকে সরাসরি সতর্কবার্তা পেয়েছে।
পরিস্থিতির এই দ্রুত পরিবর্তন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। প্রণালি সাময়িকভাবে খোলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে গেলেও পুনরায় নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই পথ দিয়ে হওয়ায় যেকোনো ধরনের অচলাবস্থা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে ইরানের অবস্থানকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি না হলে যুদ্ধবিরতি বাতিল হতে পারে এবং মার্কিন নৌ অবরোধ আরও জোরদার করা হবে। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব জানায়, তাদের নৌবাহিনী যেকোনো সংঘাতে প্রতিপক্ষকে ‘তিক্ত পরাজয়’ দিতে প্রস্তুত।
কূটনৈতিক অঙ্গনেও একই ধরনের অচলাবস্থা দৃশ্যমান। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় কিছু সীমিত অগ্রগতি হলেও মূল ইস্যুগুলোতে এখনও বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
তার মতে, চূড়ান্ত সমঝোতার কাছাকাছিও দুই পক্ষ এখনও পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে অবস্থানগত পার্থক্য কাটেনি।
গালিবাফ আরও বলেন, ইরান ধাপে ধাপে এবং পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে আলোচনা এগিয়ে নিতে চায়, যেখানে একতরফা চাপ গ্রহণযোগ্য নয়।
একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সামরিক চাপ প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে এবং এখন মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি কেবল একটি বাণিজ্যিক নৌপথ নয়, বরং এটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শক্তির লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তেহরান এই প্রণালিকে কৌশলগত বার্তা দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে, আর ওয়াশিংটন তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে। ফলে পাল্টাপাল্টি অবরোধ, অনিশ্চিত যুদ্ধবিরতি এবং স্থবির আলোচনা সব মিলিয়ে অঞ্চলটি আবারও একটি অস্থির ও ঝুঁকিপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








