লেবাননে যুদ্ধবিরতির জেরে হরমুজ প্রণালি খুলে দিলো ইরান
ছবি: সংগৃহীত
লেবাননে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বিশ্ব-অর্থনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন।
দীর্ঘ ৩৯ দিনের তীব্র সংঘাতের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মধ্য দিয়ে অঞ্চলটিতে কিছুটা স্থিতিশীলতার আভাস মিলছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং আইআরজিসি ঘনিষ্ঠ বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ জানায়, ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থা পূর্বে নির্ধারিত সমন্বিত রুট অনুযায়ী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র জোটের মধ্যে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সময় এই কৌশলগত জলপথটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
তেহরানের দাবি, গত ৪০ দিনের সংঘাতে তারা মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে অন্তত ১০০ দফা সফল পাল্টা হামলা চালিয়ে তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। মূলত লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ এবং ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, যার মধ্যস্থতায় প্রধান ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান।
তবে এই যুদ্ধবিরতি অর্জনের পথ অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ ছিল। গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রস্তাব গ্রহণ করলেও ইসরায়েলি চাপে কিছুটা পিছু হটেছিল, যার পরপরই লেবাননে ভয়াবহ হামলায় ৩০০ জনের প্রাণহানি ঘটে। পরবর্তীতে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ইরান কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে এবং লেবাননে হামলা বন্ধ না হলে আলোচনা বয়কটের হুঁশিয়ারি দেয়। কূটনৈতিক এই চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউস থেকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। যদিও গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান মেলেনি, তবুও সাময়িক এই স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে সমুদ্রপথ সচল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান।
আরও পড়ুন: স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ছাড়া কোনো সমঝোতা নয়: ইরান
এদিকে যুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ফুটে উঠেছে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অভিযানে ইরানে ২০৭৬ জন নিহত এবং ২৬ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এর মধ্যে মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬৮ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় তুলেছে। এই মানবিক সংকটের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি সুরক্ষিত করতে এবং ইরানের যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বিশ্ব অর্থনীতিকে রক্ষা করতে প্যারিসে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সভাপতিত্বে আয়োজিত এই বৈঠকে প্রায় ৪০টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন।
প্যারিস সম্মেলনে যোগ দিয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক জোট গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি জানান, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার ফলে বিশ্বজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। ব্রিটিশ জনগণের ওপর আর্থিক চাপ কমাতে এবং স্থায়ীভাবে সমুদ্রপথটি উন্মুক্ত রাখতে কূটনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনার সমন্বয়ে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি। তবে এই আন্তর্জাতিক তৎপরতার মধ্যেই নিজ দেশে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন স্টারমার। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনের নিরাপত্তা ছাড়পত্র সংক্রান্ত বিতর্ক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপের বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে ব্রিটিশ সরকার ও দ্য গার্ডিয়ানের মতো সংবাদমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার এই ঘোষণা আপাতদৃষ্টিতে তেহরানের একটি বড় কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিজয়। তবে এই যুদ্ধবিরতি কতদিন স্থায়ী হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথটি কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নির্ভর করছে আসন্ন দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপের ওপর।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








