গাজায় দুধের তীব্র অভাব, মৃত্যুর ঝুঁকিতে শতাধিক শিশু
ছবি: সংগৃহীত
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বোমা হামলার তাণ্ডবে প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনি শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে। পাশাপাশি, খাদ্য ও বিশেষ করে নবজাতক ও ছোট শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় বেবি ফর্মুলার তীব্র অভাবে শত শত শিশু মৃত্যুর মুখে।
গাজার শিশু হাসপাতালগুলোতে শিশুদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ; শিশুদের শরীর চামড়া আর হাড়ের ঢাঁচা ছাড়া কিছু অবশিষ্ট নেই বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. আহমেদ আল-ফাররা জানিয়েছেন, তার ওয়ার্ডে মাত্র এক সপ্তাহের প্রয়োজনীয় শিশুখাদ্য বাকি আছে। অকালে জন্মানো শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ফর্মুলা শেষ হয়ে গেছে, তাই চিকিৎসকরা বাধ্য হয়ে সাধারণ শিশুখাদ্য ব্যবহার করছেন। হাসপাতালের বাইরে থাকা অসংখ্য শিশু আছে যাদের জন্য একটুও শিশুখাদ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনি মা হানা আল-তাওয়েল, যিনি নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে থাকেন, জানান তিনি নিজের অপুষ্টির কারণে বুকের দুধ দিতে পারছেন না। তার ১৩ মাস বয়সী ছেলে শিশুটির জন্য তিনি বেবি ফর্মুলা খুঁজতে গিয়ে হতাশ। চিকিৎসকরা বলেছেন, অপুষ্টির কারণে তার ছেলের বিকাশ অনেক পিছিয়ে পড়েছে, হাঁটা ও কথা বলায় অন্য শিশুদের থেকে অনেক ধীরগতি রয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কমপক্ষে ৬৬ জন ফিলিস্তিনি শিশু অনাহারে মারা গেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল গাজায় খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহে বাধা দিয়ে জনবসতির ওপর ক্ষুধা প্রয়োগকে ‘গণহত্যার কৌশল’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ‘কোগ্যাট’ দাবি করেছে, তারা গাজায় বেবি ফর্মুলাসহ শিশুখাদ্যের প্রবেশে কোনো বাধা দিচ্ছে না এবং সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে ১,৪০০ টনেরও বেশি শিশুখাদ্য সরবরাহ করেছে। তবে, চিকিৎসক ও স্থানীয়রা বলছেন, বাস্তবে ফর্মুলার সরবরাহ খুবই সীমিত এবং প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। অনেক চিকিৎসক তাদের ব্যক্তিগত লাগেজে শিশুখাদ্য নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী তা জব্দ করছে।
আরও পড়ুন: গাজায় এক দিনে নিহত ১৩৮, মোট মৃতের সংখ্যা ৫৭ হাজার ছাড়াল
ফিলিস্তিনি-জার্মান চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. ডায়ানা নাজ্জাল জানান, তারা গাজায় ওষুধের বদলে প্রোটিন বার ও বাদামের মতো ক্যালোরি-ঘন খাবার নিয়ে প্রবেশ করছেন, কারণ বেবি ফর্মুলার প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
বর্তমানে গাজায় প্রায় ৫ লাখ মানুষ মারাত্মক খাদ্য সংকটে ভুগছেন, যেখানে শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে আশঙ্কাজনক। খাদ্যের অভাবে অনেক মা স্তন্যদান করতে অক্ষম, তাই ফর্মুলার চাহিদা বেড়েছে। বাজারে যে সামান্য ফর্মুলা পাওয়া যাচ্ছে, তার দাম স্বাভাবিকের প্রায় ১০ গুণ বেশি, প্রায় ৫০ মার্কিন ডলার প্রতি ক্যান।
খান ইউনিসে আশ্রয় নেওয়া ২৫ বছর বয়সী নূরহান বারাকাত জানান, খাবারের অভাবে তিনি একমাস মাত্র স্তন্যদান চালাতে পেরেছেন। তিনি জানালেন, বুকের দুধ শিশুর জন্য অত্যন্ত জরুরি এবং মা ও সন্তানের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলে, কিন্তু এ পরিস্থিতিতে তিনি অসহায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম ঘেব্রেয়েসাস জুন ২০২৫ শেষে জানিয়েছেন, গাজার হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ১১২ জন শিশু অপুষ্টিতে ভুগে চিকিৎসাধীন। অপুষ্টি তিন বছরের আগে শিশুদের বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি ঘটাতে পারে।
ডা. থায়ের আহমেদ, যারা আন্তর্জাতিক গ্রুপ ‘আভাজে’র মাধ্যমে সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, বলেন, “যখন শিশুদের মৃত্যু শুরু হবে, তখন ভয়াবহ আতঙ্ক তৈরি হবে। খাদ্য সংকটে শিশুরাই প্রথম মারা যায়।”
ইসরায়েলি অবরোধ: গাজায় মানবিক সহায়তা ও খাদ্য সামগ্রীর প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং অনেক ট্রাক প্রবেশে বাধা দেয়ায় খাদ্য সংকট তীব্র হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা সীমাবদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত বেসরকারি সংস্থা গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) খাদ্য সহায়তা দিলেও তাতে শিশুখাদ্য অন্তর্ভুক্ত নয়।
অতিরিক্ত মূল্য: বাজারে ফর্মুলার দাম বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ তা কিনতে পারছেন না।
গাজার শিশু খাদ্য সংকট বিশ্ব মানবতার একটি মারাত্মক সংকট। যুদ্ধ ও অবরোধের মধ্যে শিশুরা শুধু বোমা হামলায় নয়, অনাহার ও অপুষ্টিতে মৃত্যুর সঙ্গেও লড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ ও অবরোধ মুক্তির মাধ্যমে মানবিক সহায়তা অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করাই একমাত্র উপায় গাজার শিশুদের প্রাণ রক্ষার জন্য।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








