News Bangladesh

|| নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৬:০০, ১৬ এপ্রিল ২০১৫
আপডেট: ০৪:৩৭, ১৯ জানুয়ারি ২০২০

রামপুরা ট্রাজেডি

শোকে স্তব্ধ, আর্তনাদ-আহাজারিতে বিচারের মিনতি

শোকে স্তব্ধ, আর্তনাদ-আহাজারিতে বিচারের মিনতি

ঢাকা: “কার কাছে বিচার চামু? কীসের বিচার চামু? আমার মা, বাপ আর বউ যে মইরা গেছে, হেগোরে কেউ ফিরাইয়া দিতে পারব? এর বিচার আল্লাহই করব।” চোখ মুছতে মুছতে কথাগুলো বললেন সবুজ। স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কিন্তু কোনো সান্ত্বনাতেই সবুজকে শান্ত করা যাচ্ছে না। থেমে থেমে ডুকরে কেঁদে উঠছেন তিনি। ঝিলপাড়ে ঘর দেবে যাওয়ার ঘটনায় সবুজ হারিছেন তার বাবা নিজাম, মা কল্পনা বেগম ও স্ত্রী রোকসানাকে।

সবুজের মতো আরও অনেকেই হারিয়েছেন স্বজন। রামপুরার ঝিলপাড় তাই স্তব্ধ শোকে। আর্তনাদ আর আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাটি। সেখানে বসবাসরত অনেকের চোখে মুখেই ছড়িয়ে আছে আতঙ্ক। বাংলা নববর্ষের দ্বিতীয় দিন এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মেনে নিতে পারছেন না কেউই। আর স্বজন হারানো মানুষগুলো বারবার মিনতি করে চাইছেন এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার।

ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে ঝিলপাড়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় মানুষের উপচে পড়া ভিড়। দেবে যাওয়া ঘর দেখতে শত শত মানুষ ছুটে এসেছে চারপাশ থেকে। এ যাবত ১২ জন নিহত হলেও আরও অন্তত ১৫ জন নিখোঁজ আছেন বলে জানান স্বজনরা। তবে নিখোঁজদের উদ্ধারে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ১২ জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পুলিশের মতিঝিল জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ফরিদ উদ্দিন। তিনি বলেন, “কয়েকজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে স্বজনরা অভিযোগ করেছেন। তাদের খোঁজে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে।”

এরইমধ্যে জীবিত অবস্থায় বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে। একজনও বাকি থাকতে উদ্ধার কাজ বন্ধ করা হবে না।

জানা যায়, দেবে যাওয়া দোতলা টিনশেডে মোট ২২টি ঘর ছিল।। এতে প্রায় দেড়শতাধিক লোক থাকত।  বুধবার দুপুরের পর সাড়ে ৩টার দিকে হঠাৎ করেই খুঁটিসহ নিচতলার ঘরগুলো কাদাপানিতে দেবে যায়। তাৎক্ষণিক খবর পেয়ে উদ্ধারে ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

এ ঘটনায় নিহতরা হলেন নিজাম,  কল্পনা বেগম, ছেলে সবুজের বউ রোকসানা, রিকশাচালক মিজানুর রহমান,  স্থানীয় মুদি দোকানদার বরিশালের হারুণ অর রশিদ, সাইফুল ইসলাম, সাজিদা, ফারজানা, জাকির, জোস্না বেগম ও রুনা। নিহত অপরজনের নাম পরিচয় পাওয়া যায়নি।

নিহত সাইফুলের বয়স ১৪ বছর। তার মামা আহাদ বুক চাপড়ে বলেন, “আমার ভাইগনাডা খুব বুদ্ধিমান আছিল। মনে করছিলাম বড় হইয়া বোনের দুঃখ দূর করতে পারব। এখন তো সব স্বপ্ন পানিতে ডুইবা মরছে। আমার ভাইগনারে কই পামু।” তার কান্নার শব্দ শুনে পাশ থেকে কেঁদে ওঠেন নিহত সাজিদার এক স্বজন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি হুঁশ হারিয়ে ফেলেন। পরে তাৎক্ষণিকভাবে তাকেও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে জানা যায় নিহত সাজিদা ওই ঘরের ম্যানেজার আরজত আলীর মা।

ঘর দেবে যাওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। তারা অভিযোগ করেন, নিম্নআয়ের মানুষ বলে এখানে মুখ খুলে কথা বলার কেউ নেই। সে সুযোগে ঘরের মালিকরা নিম্নমানের ঘর বানিয়ে হাজার হাজার টাকা ভাড়া আদায় করে নিচ্ছে। কিন্তু তারা দুর্ঘটনার কোনো দায়ভার নিচ্ছে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, এখানে অবৈধভাবে ঘর বানিয়ে ভাড়া দেয়া হয়েছে। ঝিলের ওপরের একটা ঘরের অবকাঠামোরও কোনো কিছু ঠিক নেই। যখন তখন অন্য যে কোনো ঘরও ভেঙে পড়ে যেতে পারে।

তাদের  অভিযোগ, স্থানীয় সরকারদলীয় নেতারা এসব ঘরের মালিক। পুলিশ আর নেতারা মিলেই সব নিয়ন্ত্রণ করেন। তাই কেউ কিছু বলার সাহস পায় না। তারা এ ঘটনায় ঘরের মালিকের অবহেলার জন্য তার বিচার দাবি করেন।

দেবে যাওয়া ঘরে সবাই ছিলেন নিম্নআয়ের মানুষ। এদের বেশিরভাগই গার্মেন্ট কর্মী, দিনমজুর, রিকশাচালক, দোকানের কর্মচারি, চায়ের দোকানদারসহ বিভিন্ন পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

ঘরের মালিক যুবলীগ নেতা

দেবে যাওয়া ঘরের মালিক যুবলীগ নেতা মনিরুজ্জামান চৌধুরী মনির। তিনি ঢাকা যুবলীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক বলে জানা গেছে। এ ঘটনার পর মনিরের কোনো খোঁজ পাওয়া না গেলেও তার লোকজন স্থানীয় বাসিন্দাদের গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলার জন্য নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বৃহস্পতিবার সকালে একজনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়েই এ প্রমাণ পাওয়া যায়। পাশ থেকে অন্যজন এসে তাকে কথা বলতে নিষেধ করেন।

খোঁজ নিয়ে যায়, বাড়িটির ভাড়া তোলা ও পরিচালনার দায়িত্বে  ছিলেন আরজত আলী নামে একজন। বাড়িটির নিচতলাতেই তিনি পরিবার নিয়ে থাকতেন। এ ঘটনায় আরজত আলীর মা সাজেদা ও মেয়ে ফারজানাও মারা গেছেন।

এদিকে, মনির কোথায় আছেন এ বিষয়ে কেউ কোনো খোঁজ দিতে পারিননি। স্থানীয় যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলেও কিছু জানা যায়নি।

নিহতের জন্য ২০ হাজার, আহতকে ৫ হাজার

ঘর দেবে যাওয়ার ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের দাফন ও আনুষঙ্গিক কাজে ২০ হাজার টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা জেলা প্রশাসন। এছাড়া আহতদের চিকিৎসায় দেয়া হবে ৫ হাজার টাকা করে। জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন মিয়া এ ঘোষণার কথা জানান।

পাশাপাশি উদ্ধার তৎপতার সার্বিক দেখভালের জন্য একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষও খোলা হয়েছে। এতে একজন ম্যাজিস্ট্রেট সার্বক্ষণিক রয়েছেন। এ কক্ষ থেকেই তাৎক্ষণিকভাবে নিহত ও আহতদের জন্য অনুদানের অর্থ দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নিখোঁজদেরও তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।

জীবনের কোনো মূল্য নেই

রামপুরায় ঘর দেবে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেন, মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই। ফলে যে যেখানে যেভাবে পারছে, মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে। মানুষ নিয়ে খেলা বন্ধ না করলে পরিণতি ভয়াবহ হবে।

বৃহস্পতিবার কথা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “কী বলব আর? নিম্ন আয়ের মানুষ বলে তাদের জীবন নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলবে সবাই? ডোবার মধ্যে বাঁশ দিয়ে ঘর বানিয়ে মানুষ রাখা হচ্ছে। এটা চিড়িয়াখানা নাকি? আমার আসলে বলার কিছু নেই।”

প্রবীণ আইনজীবী ব্যরিস্টার রফিকুল হক বলেন, “এটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা। রানা প্লাজা ধসে পড়ে হাজার মানুষ মারা গেছে। এখন ডোবায় ঘর দেবে এক ডজন মারা গেল। এভাবে মানুষ মারা যাওয়ার দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে। কারা এসব করে, কীভাবে সাহস পায়, আমার বুঝে আসে না।”

তবে এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি শোক জানিয়েছেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এমএ/এফই

নিউজবাংলাদেশ.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়