প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠক গণসংগীতশিল্পী কামরুদ্দীন আবসারের প্রয়াণ
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব, প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও বিশিষ্ট সংগীত শিক্ষক কামরুদ্দীন আবসার আর নেই।
শনিবার (৩০ মে) রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর বিআইএসএইচ (BISH) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক গভীর শোক ও শূন্যতার ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সুরকে হাতিয়ার করা এই গুণী শিল্পীর প্রয়াণে প্রগতিশীল চেতনার এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
পারিবারিক ও সহকর্মী সূত্রে জানা গেছে, কামরুদ্দীন আবসার দীর্ঘদিন ধরে নানাবিধ জটিল শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। ২০১১ সালে তিনি প্রথমবার গুরুতর স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, যার পর থেকে তাঁর শারীরিক সক্ষমতা অনেকটাই কমে যায়। পরবর্তীতে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসকদের পরামর্শে নিজ বাসভবনেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। সম্প্রতি তাঁর শারীরিক অবস্থার নতুন করে চরম অবনতি ঘটে, যখন তিনি মারাত্মক নিউমোনিয়া এবং ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হন। এর ফলে গত ১৪ মে তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে রাজধানীর বিআইএসএইচ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি ঘটায় পরবর্তীতে তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে শনিবার রাতে তিনি বিদায় নেন।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক সন্তান, অসংখ্য গুণগ্রাহী, সহকর্মী ও শিষ্য রেখে গেছেন। তাঁর সহধার্মীনি ফেরদৌসী বেগম একজন প্রখ্যাত কবি এবং তাঁদের একমাত্র সন্তান আদনান মুকিত দেশের শিশু-কিশোরদের অত্যন্ত জনপ্রিয় মাসিক ম্যাগাজিন ‘কিশোর আলো’-র নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কামরুদ্দীন আবসার আজীবন বামপন্থী আদর্শভিত্তিক প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রগতিশীল লেখক সংগঠন ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’-এর সঙ্গে দীর্ঘকাল যুক্ত থেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এর পাশাপাশি সমাজবদলের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম ‘গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট’-এর সক্রিয় সংগঠক হিসেবে কৃষক, শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। দেশের অন্যতম প্রধান প্রগতিশীল গণসংগীতের দল ‘সৃজন’-এর সঙ্গেও ছিল তাঁর নিবিড় ও দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্ক। প্রগতিশীল ঘরানার বই প্রকাশনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন এবং ‘দীপ্র’ নামে তাঁর একটি সুপরিচিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছিল, যেখান থেকে মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতিশীল চিন্তার বহু বই প্রকাশিত হয়েছে। সহকর্মীদের চোখে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান, নির্লোভ, নিরহংকার এবং এক সাহসী সাংস্কৃতিক সংগঠক, যিনি শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কখনো আপস করেননি।
আরও পড়ুন: বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজছেন বাঁধন
গণসংগীতের চর্চা, রচনা ও সুরারোপের ক্ষেত্রে কামরুদ্দীন আবসার এক অনন্য নাম। ২০০৬ সালে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লাখনি রক্ষার জন্য যে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাতে গণসংস্কৃতি ফ্রন্টের পক্ষ থেকে তিনি মাঠপর্যায়ে অনন্য ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। বামপন্থি সংস্কৃতিকর্মী ও প্রখ্যাত লেখক মহসিন শস্ত্রপাণির লেখা অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিপ্লবী গান ‘বলো জয় জাগ্রত বীর জনগণ, হঠাও সাম্রাজ্যবাদ…’-এর কালজয়ী সুরকার ছিলেন কামরুদ্দীন আবসার। এই গানটি ফুলবাড়ী আন্দোলনের সময়ে রাজপথের আন্দোলনকারীদের প্রধান উদ্দীপক সংগীতে পরিণত হয়েছিল এবং হাজার হাজার মানুষকে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
গণসংগীতের পাশাপাশি তিনি শিশুদের জন্য অসংখ্য ছড়া ও গানে সুরারোপ করেছেন, যা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ অবদান হিসেবে স্বীকৃত। প্রখ্যাত গণসংগীত ব্যক্তিত্ব হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানের অন্যতম সেরা গায়ক ছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, বর্তমান প্রজন্মের অনেক প্রতিষ্ঠিত সংগীতশিল্পীর ওস্তাদ ও শিক্ষক ছিলেন তিনি। অসংখ্য কিশোর ও তরুণকে তিনি নিজ হাতে সংগীতের দীক্ষা দিয়েছেন।
তাঁর প্রয়াণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গভীর শোক ও স্মৃতিচারণ করেছেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
তিনি লিখেছেন, গত শতকের ৭০-এর দশকের শেষভাগ থেকে কামরুদ্দীন আবসারকে তিনি চিনেছেন। ৮০ ও ৯০-এর দশকে তাঁরা দীর্ঘ সময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন করেছেন। তিনি আজীবন মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের পাশে নিজের সুর ও কণ্ঠ নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। দেশের কতশত প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি শক্তি জুগিয়েছেন এবং কত মানুষ তাঁর গানে প্রাণ পেয়েছেন, তার কোনো হিসাব নেই। তিনি ছিলেন অসংখ্য কিশোর ও তরুণের গানের প্রিয় শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক।
পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মরহুম কামরুদ্দীন আবসারের মরদেহ সর্বসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আগামী সোমবার সকালে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত তাঁর মরদেহ রাখা হবে, যেখানে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণ তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করবেন। শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শেষ হওয়ার পর মরহুমের মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে নিয়ে যাওয়া হবে এবং সেখানে জোহরের নামাজ শেষে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
তাঁর মৃত্যুতে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বাংলাদেশ লেখক শিবির, গণসংস্কৃতি ফ্রন্টসহ দেশের বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কামরুদ্দীন আবসারের এই অসামান্য অবদান বাংলাদেশ চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ রাখবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








