মে মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন বেড়ে ৩২৬, ধর্ষণ বৃদ্ধি ৪৪%
ফাইল ছবি
দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহতা ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, যার সর্বশেষ প্রমাণ মিলেছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর সদ্য প্রকাশিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা মনিটরিং প্রতিবেদনে।
সংস্থাটির সংগৃহীত ও বিশ্লেষিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসের তুলনায় মে মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা কেবল বাড়েইনি, বরং তা এক উদ্বেগজনক রূপ পরিগ্রহ করেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, এপ্রিল মাসে যেখানে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল ৩১২টি, মে মাসে তা এক লাফে ৩২৬টিতে গিয়ে পৌঁছেছে।
সমাজতাত্ত্বিক ও মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের সার্বিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি জেঁকে বসার এক স্পষ্ট ও অশুভ সংকেত।
রবিবার (৩১ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো এমএসএফ-এর এই প্রতিবেদনে মে মাসের অপরাধচিত্রের যে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত শিউরে ওঠার মতো। বিশেষ করে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে এক চরম উল্লম্ফন লক্ষ্য করা গেছে।
এপ্রিল মাসে সারাদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ৫৪টি, যা মে মাসে এসে দাঁড়িয়েছে ৭৮টিতে। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। অপরাধের ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়; মে মাসে পাশবিকতার মাত্রা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে, যা দলবদ্ধ বা সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বৃদ্ধির পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা এপ্রিলের ১৪টি থেকে বেড়ে মে মাসে ১৬টিতে উন্নীত হয়েছে। সবচেয়ে নির্মম চিত্র দেখা গেছে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় এপ্রিলে এই সংখ্যা ২ জন থাকলেও মে মাসে তা তিনগুণ বেড়ে ৬ জনে গিয়ে ঠেকেছে। এর পাশাপাশি, একই সময়ে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন আরও ১৮ জন নারী ও শিশু, যা পূর্ববর্তী মাসের (১৭ জন) তুলনায় ঊর্ধ্বমুখী।
এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, আইনের সঠিক ও কঠোর প্রয়োগের অভাবে অপরাধীরা ক্রমশ দুঃসাহসী হয়ে উঠছে এবং ফলশ্রুতিতে সমাজ ও পরিবারে নারীদের অবস্থান দিন দিন মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন: জাতিসংঘের ‘দাগ হ্যামারশোল্ড মেডেল’ পাচ্ছেন বাংলাদেশের ৬ বীর শান্তিরক্ষী
এবারের প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন নারী ও শিশু নির্যাতনের সনাতন রূপের বাইরে অপরাধ জগতের কিছু নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক মাত্রার ওপর আলোকপাত করেছে।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমান সময়ে ডিজিটাল অপরাধ এবং সামাজিক অবক্ষয় পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলছে, যার অন্যতম বড় অনুঘটক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে অনলাইন জুয়া ও মাদক। প্রযুক্তিকে অপব্যবহার করে ছড়িয়ে পড়া অনলাইন জুয়ার মরণকামড়ে মে মাসে শুধু একজনের প্রাণহানিই ঘটেনি, বরং এই অপরাধচক্রের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। একই সাথে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক সংক্রান্ত সহিংসতা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসে মাদককে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতায় ৪ জন নিহত এবং ১৯ জন গুরুতর আহত হয়েছেন, পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন আরও ১৫ জন অপরাধী। পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে মাদক ব্যবসার সাথে খোদ পুলিশ প্রশাসনের কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং পুলিশের সাথে দুটি সরাসরি সংঘর্ষের ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
প্রতিবেদনে মাদক ব্যবসার সাথে পুলিশের জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগের তথ্যও স্থান পেয়েছে, যা বিচারব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পূরণে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্ন ও গভীর সংশয় তৈরি করেছে।
এমএসএফ-এর নির্বাহী সারসংক্ষেপে সামগ্রিক পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রকৃতি এখন আর কোনো একক বা সরল অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন অত্যন্ত জটিল, বহুমুখী এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করছে। যদিও মাঠপর্যায়ে কিছু কিছু প্রকাশ্য সহিংসতার ঘটনা সংখ্যার বিচারে কিছুটা কমতে দেখা গেছে, কিন্তু তার বিপরীতে যৌন সহিংসতা, সাইবার বা ডিজিটাল অপরাধ এবং সামাজিক নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ের সূচকগুলো জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং মাদকের সহজলভ্যতা এই অপরাধের আগুনকে আরও উস্কে দিচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থাটি দৃঢ়ভাবে মনে করে, কেবল লোকদেখানো অভিযান বা খণ্ডকালীন উদ্যোগ দিয়ে এই গভীর সামাজিক ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়। নারীদের জন্য একটি নিরাপদ বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তুলতে হলে অবিলম্বে বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে, প্রতিটি অপরাধের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং সেই সাথে অনলাইন জুয়া ও মাদক সিন্ডিকেটের শিকড় উপড়ে ফেলতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








