আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:১৬, ২৯ মে ২০২৬

সাইপ্রাসে এস আলমের বাড়ি ক্রোক, ৮০০ কোটি ইউরো পাচারের তদন্ত

সাইপ্রাসে এস আলমের বাড়ি ক্রোক, ৮০০ কোটি ইউরো পাচারের তদন্ত

ছবি: সংগৃহীত

ব্যাংক জালিয়াতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম মাসুদ) এবং তার স্ত্রীর মালিকানাধীন সাইপ্রাসের একটি বিলাসবহুল সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা প্রক্রিয়ার (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স) আওতায় আনুষ্ঠানিক অনুরোধের প্রেক্ষিতে দেশটির নিকোসিয়া জেলা আদালত গত ১৯ মে এই ক্রোকের আদেশ জারি করে। 

সাইপ্রাসের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘সাইপ্রাস মেইল’-এর গত ২৮ মে-র প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট আইনি নথির সূত্রে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। 

সাইপ্রাসের মানি লন্ডারিংবিরোধী বিশেষ ইউনিট ‘মোকাস’ (MOCAS) আদালতের কাছে এই সম্পত্তি জব্দের আবেদনটি করেছিল। জব্দকৃত সম্পত্তিটি সাইপ্রাসের অভিজাত পারেক্লিসিয়া এলাকায় অবস্থিত একটি সুদৃশ্য ও আধুনিক দ্বিতল আবাসিক ভবন (বাড়ি)। আন্তর্জাতিক মহলে প্রভাবশালী এই বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে সাইপ্রাস কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপকে অর্থপাচার রোধে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আর্থিক অপরাধ দমনের প্রচেষ্টাকে আরও বেগবান করেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ সাইফুল আলম ২০১৬ সালে সাইপ্রাসের বিতর্কিত ‘সিটিজেন-বাই-ইনভেস্টমেন্ট’ বা ‘বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব’ কর্মসূচির আওতায় দেশটির নাগরিকত্ব লাভ করেন, যা বিশ্বজুড়ে সাধারণত ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ স্কিম নামে পরিচিত। বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের বিনিময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই দেশটির পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগটি নিয়েছিলেন তিনি। যদিও পরবর্তী সময়ে নানামুখী বিতর্ক ও আইনি ত্রুটির কারণে সাইপ্রাস সরকার এই বিশেষ নাগরিকত্ব কর্মসূচিটি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়। 

মজার বিষয় হলো, পরবর্তীতে এই কর্মসূচির অনিয়ম খতিয়ে দেখতে গঠিত সাইপ্রাস সরকারের বিশেষ পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে সাইফুল আলমের নাম সরাসরি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে বৈশ্বিক অর্থপাচারের রুট হিসেবে সাইপ্রাসকে ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার এই নাগরিকত্ব বড় ভূমিকা রেখেছিল বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা। বর্তমানে সাইপ্রাসের আদালতে সম্পত্তি জব্দের এই আদেশের পর তাঁর আন্তর্জাতিক আইনি সুরক্ষা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে।

বাংলাদেশি তদন্তকারী সংস্থাগুলোর সংগৃহীত ও সাইপ্রাস কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো বিস্তারিত আইনি নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দেড় দশকে এস আলম গ্রুপ এবং তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো একটি বিশাল ও জটিল প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। এই নেটওয়ার্কের আওতায় শত শত বেনামি ও ভুয়া কোম্পানি সৃষ্টি করে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। তদন্তের মূল পরিধিতে রয়েছে ঋণ জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিভিন্ন দেশের জটিল ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক স্তরে অর্থপাচার। 

আরও পড়ুন: সীমান্তে জড়ো হওয়া শতাধিক অনুপ্রবেশকারীকে হোল্ডিং সেন্টারে স্থানান্তর

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর সম্প্রতি প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট এবং সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এস আলম ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮ বিলিয়ন ইউরোরও (৮০০ কোটি ইউরো) বেশি অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। 

বাংলাদেশি তদন্ত কর্মকর্তাদের দৃঢ় ধারণা, এই পাচারকৃত বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রিয়েল এস্টেট, বিলাসবহুল সম্পত্তি ও অফশোর কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে, যার সুতো ধরে এখন আন্তর্জাতিক স্তরে অনুসন্ধান চলছে।

সাইপ্রাসের আদালতে সম্পত্তি জব্দের এই ঐতিহাসিক আদেশের ঠিক এক দিন পরেই বাংলাদেশে আরেকটি বড় আইনি ধাক্কা খেয়েছে এই গ্রুপটি। দেশের শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড’ থেকে প্রায় ৬০ লাখ ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮০ কোটি টাকারও বেশি) ঋণ নিয়ে অর্থ আত্মসাতের একটি মামলায় মোহাম্মদ সাইফুল আলমসহ তার পরিবারের ১০ জন আত্মীয় ও সহযোগীকে পাঁচ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন বাংলাদেশের একটি আদালত। 

মামলার বিবরণী ও বাংলাদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য ১৩৪টি যাত্রীবাহী বাস কেনার উদ্দেশ্যে এই বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তবে কোনো বাস কেনা হয়নি এবং সম্পূর্ণ অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে আত্মসাৎ করা হয়। 

তদন্তকারীরা স্পষ্ট করেছেন যে, এস আলমের আর্থিক অপরাধের পরিধি কেবল এই একটি মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ইচ্ছামতো বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যার সিংহভাগই পরবর্তী সময়ে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ‘খেলাপি’ ঋণে পরিণত হয়।

আন্তর্জাতিক এই অর্থপাচার চক্রের গভীরতা উদঘাটনে তদন্তকারীরা এখন সাইপ্রাসে নিবন্ধিত ‘এক্লেয়ার ইন্টারন্যাশনাল’ (ACLARE International) নামের একটি বিশেষ কোম্পানির কার্যক্রম নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছেন। ২০১৬ সালে ‘এক্লেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান কিনে নেওয়ার পর মোহাম্মদ সাইফুল আলম এই এক্লেয়ার ইন্টারন্যাশনালকে সম্পূর্ণ অধিগ্রহণ করেছিলেন। 
বাংলাদেশি তদন্তকারীদের ধারণা, এই কোম্পানিটি বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থের অবৈধ লেনদেন ও তা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট বা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এর পাশাপাশি সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস (BVI) এবং জার্সির মতো আন্তর্জাতিক ট্যাক্স হ্যাভেন বা করস্বর্গ হিসেবে পরিচিত দ্বীপগুলোতে গড়ে তোলা এস আলমের একাধিক কোম্পানি ও ট্রাস্ট নেটওয়ার্কের জটিল মালিকানা কাঠামো এবং আর্থিক প্রবাহ শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

এদিকে নিজের পিঠ বাঁচাতে মোহাম্মদ সাইফুল আলম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের আইনি লড়াই শুরু করেছেন। বিশ্বখ্যাত ও প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠান ‘কুইন ইমানুয়েল’ (Quinn Emanuel)-এর আইনজীবীদের মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে এস আলম দাবি করেছেন যে, তার ও তার পরিবারের সমস্ত বৈশ্বিক বিনিয়োগ সম্পূর্ণ বৈধ বিদেশি উৎস থেকে এসেছে এবং বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে নেওয়া এই পদক্ষেপগুলো রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অন্যায্য। 

একই সাথে, তিনি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্র বা ‘আইসিএসআইডি’ (ICSID)-এর দ্বারস্থ হয়েছেন। সেখানে তিনি দাবি করেছেন যে, তার এবং তার পরিবারের সম্পদের ওপর বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের এই ক্রোক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির চরম লঙ্ঘন। তবে বাংলাদেশ সরকারের দৃঢ় অবস্থান এবং বৈশ্বিক মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারির কারণে এই আন্তর্জাতিক অর্থপাচার মামলার তদন্ত দিন দিন আরও জোরালো হচ্ছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়