বাজেটে ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ’ নেই: এনবিআর
ছবি: সংগৃহীত
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনায় ‘কালো টাকা সাদা করার’ বিতর্কিত কোনো সুযোগ রাখা হয়নি বলে দাবি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বাজেট ঘোষণার পর বিভিন্ন মহল থেকে এই বিষয়ে যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে, তাকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা।
প্রতিবার বাজেট ঘোষণার সময় অপ্রদর্শিত আয় বা ‘কালো টাকা’ বৈধ করার সুযোগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। বিভিন্ন মহল থেকে এবার এই সুযোগ না রাখার দাবি জানানো হয়েছিল। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অর্থবিলে জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনার ক্ষেত্রে অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেখে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি-র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনসহ বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ এই বিষয়টিকে ‘সমর্থনযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেন। সাংবাদিকরা সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন তোলেন যে, এই সুযোগটি বাদ দিয়ে বাজেটকে পুরোপুরি কালো টাকা মুক্ত করা যেত কি না।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান, এটি কালো টাকা সাদা করার কোনো প্রভিশন (বিধান) নয়। বরং সম্পত্তি লেনদেনে ‘প্রকৃত মূল্য’ ঘোষণার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের কর-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের একটি কৌশল। তিনি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে জমির প্রকৃত দাম ৫ কোটি টাকা হলেও রেজিস্ট্রেশন করা হয় ১ কোটি টাকায়। এতে বিক্রেতা বিপাকে পড়েন, কারণ বাড়তি ৪ কোটি টাকার উৎস তিনি দেখাতে পারেন না। গত বছর জমি বিক্রেতাদের জন্য একটি বিশেষ বিধান করা হয়েছিল, যাতে বায়নানামা ও ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের প্রমাণ সাপেক্ষে নিয়মিত কর এবং ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা কর দিয়ে তারা বাড়তি অর্থ বৈধ করতে পারেন।
আরও পড়ুন: ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা বাজেট, ৬০ নিত্যপণ্যে করছাড়
চেয়ারম্যান জানান, এবার সেই একই ধরনের যৌক্তিক সুবিধা ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট ক্রেতাদের জন্যও চিন্তা করা হয়েছে। প্রকৃত মূল্যের তুলনায় কম মূল্যে রেজিস্ট্রেশন করার কারণে পরবর্তীতে এনবিআর যখন করদাতাকে চিহ্নিত করে, তখন তারা বড় ধরনের জরিমানা ও আইনি জটিলতায় পড়েন। এই ‘রিলিফ’ দেওয়ার লক্ষ্যেই বাজেটে নতুন বিধানটি যুক্ত করা হয়েছে, যাতে তারা স্বপ্রণোদিতভাবে প্রকৃত মূল্য ঘোষণা করে কর পরিশোধ করতে পারেন। তবে তিনি এও উল্লেখ করেন, এই বিধান নিয়ে জনমনে বা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে যদি বড় ধরনের আপত্তি থাকে, তবে সরকার তা পুনর্বিবেচনা করে দেখবে।
অর্থবিলে জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের ক্ষেত্রে ‘স্বপ্রণোদিত’ বিনিয়োগ বা ক্রয়ের একটি সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা যদি তাদের ক্রয়মূল্য বা বিক্রয়মূল্যের প্রকৃত ও দলিলমূল্যের পার্থক্য ঘোষণা করেন, তবে সেই অপ্রদর্শিত অংশের ওপর নিয়মিত করহার অনুযায়ী আয়কর পরিশোধ করে তারা বৈধতা পেতে পারেন। শর্ত রয়েছে, যদি কোনো করদাতা স্বপ্রণোদিত ঘোষণার আগে এনবিআরের অডিট বা অন্য কোনো কার্যক্রমে ধরা পড়েন, তবে তাকে নিয়মিত করের পাশাপাশি অতিরিক্ত ২০ শতাংশ জরিমানা গুণতে হবে। এছাড়া, এ ধরনের সুবিধা গ্রহণকারীকে রিটার্নে ‘জীবনযাপন সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের বিবরণী’তে উৎসে কর্তিত কর উল্লেখ করতে হবে। তবে আদালতে মামলা চলমান থাকলে বা অপরাধ প্রমাণিত হলে এই সুযোগ আর পাওয়া যাবে না।
বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন। তিনি স্বীকার করেন যে, মৌজা রেট এবং বাজারের প্রকৃত মূল্যের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান রয়েছে। তিনি জানান, সরকার এই দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। ইতিমধ্যে মৌজা রেট রিভিউ করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো, পুরো বাংলাদেশের মৌজাভিত্তিক সার্ভে করে বাজার মূল্যের সাথে মৌজা রেটের সমন্বয় করা।
অর্থমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে বলেন, যখন মৌজা রেটগুলো প্রকৃত বাজারের মূল্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যাবে, তখন কালো টাকা সাদা করার মতো সুযোগের প্রয়োজনীয়তা আর থাকবে না। সেই লক্ষ্যে সরকার কাজ শুরু করেছে, তবে স্বল্প সময়ে বাজেট প্রণয়ন করতে হওয়ায় এ বছর সব কিছু পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব হয়নি।
সার্বিকভাবে, এনবিআর এবং অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এবারের বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার কোনো ঢালাও সুযোগ রাখা হয়নি, বরং সম্পত্তি খাতের কর আদায়ে স্বচ্ছতা আনাই এর মূল লক্ষ্য। তবে মৌজা রেটের সাথে বাজার মূল্যের সমন্বয় না হওয়া পর্যন্ত এই ধরনের জটিলতা ও বিতর্ক রয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








