আবার ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে রিজার্ভ
ফাইল ছবি
দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও ৩৭ বিলিয়ন ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমানা অতিক্রম করেছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরে আসার একটি শক্তিশালী সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ১২ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট (গ্রস) রিজার্ভ বেড়ে ৩৭ দশমিক শূন্য ৬৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহে ঊর্ধ্বগতি, রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে এই ইতিবাচক ধারার সূচনা হয়েছে।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মানদণ্ড অনুযায়ী, বিপিএম-৬ হিসাব পদ্ধতিতে বর্তমান রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ২৬০ বিলিয়ন ডলারে। গত ১০ দিনে দেশের গ্রস রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি সাধিত হয়েছে; মাসের শুরুতে ২ আগস্ট যেখানে মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার, সেখানে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে তা ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।
রিজার্ভ বৃদ্ধির এই ধারাকে ঘিরে অর্থনীতিবিদরা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২১ সালের আগস্টে দেশের রিজার্ভ সর্বকালের সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের চূড়ায় পৌঁছালেও পরবর্তী সময়ে ঋণ অনিয়ম, অর্থপাচার এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে ধীরগতির কারণে রিজার্ভে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছিল।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সময় মোট রিজার্ভ ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে এবং আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে তা ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ডলারের বিনিময় হার তখন ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় আমদানির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারভিত্তিক বিনিময় হার প্রবর্তন, প্রবাসী আয় বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ এবং আমদানির বিধিনিষেধ শিথিল করার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে যে স্বস্তি ফিরেছে, তা রিজার্ভ পুনর্গঠনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। যখন বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন রিজার্ভের স্থিতি ছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার (বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ৩০ বিলিয়ন ডলার), সেখান থেকে কয়েক মাসের ব্যবধানে ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘর স্পর্শ করা এক বড় অর্জন।
আরও পড়ুন: আগস্টের প্রথম ৮ দিনে প্রবাসী আয় এলো ৯১৫ মিলিয়ন ডলার
তবে অর্থনীতির প্রকৃত স্বাস্থ্য বোঝার জন্য শুধু গ্রস রিজার্ভের পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এই মোট রিজার্ভের পুরোটা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসাব করে, যেখানে আইএমএফের স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস (এসডিআর), ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্ট এবং এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) বিলের মতো দায়গুলো বাদ দেওয়া হয়। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে এই উপাত্ত প্রকাশ করে না, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশের ব্যবহারযোগ্য বা নিট রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো দেশের রিজার্ভ দিয়ে যদি তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা থাকে, তবে তাকে নিরাপদ ধরা হয়। সেই হিসাবে, মাসিক গড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় বিবেচনা করলে বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে সাড়ে পাঁচ মাসেরও বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় নির্বাহ সম্ভব, যা দেশের বহিঃস্থ খাতের সক্ষমতার শক্তিশালী প্রমাণ দেয়।
রিজার্ভের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক ঋণমান (ক্রেডিট রেটিং) উন্নত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ যদি দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকে এবং রপ্তানি খাত নতুন নতুন গন্তব্য খুঁজে নিতে পারে, তবে রিজার্ভের এই ভিত্তি আরও মজবুত হবে। বিগত বছরগুলোতে রিজার্ভ কমে যাওয়ার কারণে যে আমদানিনির্ভর শিল্পগুলো চাপের মুখে ছিল, বর্তমানে সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় উৎপাদনশীল খাতের গতিশীলতা ফিরবে বলেও আশা করা হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, সংকট কাটিয়ে রিজার্ভের এই ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ফেরা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় মাইলফলক, যা আগামী দিনগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








