কলম্বিয়ার ধ্বংসস্তূপে নবজাতকের কান্না, ৪৮ ঘণ্টা পর উদ্ধার
ছবি: সংগৃহীত
কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানা এক শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী ৭ দশমিক ৪ মাত্রার প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয়েছে।
গত সোমবার (১০ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে চোকো বিভাগের সান হোসে দেল পালমার অঞ্চলের ভূগর্ভে ১১০ কিলোমিটার গভীরে এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়।
ইউএসজিএস এবং কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এটি একুশ শতকে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প। তীব্র এই ভূমিকম্পের স্থায়ীত্ব ছিল প্রায় দুই মিনিট এবং এর প্রভাবে কলম্বিয়ার ৩২টি বিভাগের অধিকাংশ এলাকাসহ প্রতিবেশী ইকুয়েডর ও পানামায়ও ভূকম্পন অনুভূত হয়।
ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশটিতে নিহতের সংখ্যা আড়াই শ ছাড়িয়ে গেছে এবং আহত হয়েছেন আড়াই হাজারের বেশি মানুষ। কফি উৎপাদনকারী অঞ্চল তথা আন্দিজ পর্বতমালা সংলগ্ন পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কেবল কালি শহরেই ৯৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং পেরেইরা ও চোকো অঞ্চলে শত শত ভবন ধসে পড়েছে। কালির একটি স্কুলের অংশবিশেষ ধসে চার শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এছাড়া মানিজালেস ও আর্মেনিয়া শহরেও বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা, হাসপাতাল এবং চার্চ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির এক ডজনের বেশি বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, কারণ পেরেইরার মাতেকাণা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বেশ কয়েকটি এয়ারপোর্টের অবকাঠামো আংশিক ধসে পড়েছে।
আরও পড়ুন: কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প: নিহত ২২৪
উদ্ধার অভিযান চলাকালে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বেশ কিছু অলৌকিক বেঁচে থাকার ঘটনা গোটা দেশকে আশার আলো দেখাচ্ছে। কালির লা তোরেস দেল লিমোনার নামক একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবন ধসে পড়ার পর ব্রায়ান ওসোরিও জুলুয়াগা নামের এক মোটরসাইকেল আরোহী এবং স্থানীয় পুলিশ সদস্যদের তৎপরতায় এক নবজাতক ও দুই মাসের এক শিশুকে জীবন্ত উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে এক শিশুটির বাবা ভবন ধসে পড়ার মুহূর্তে নিজের শরীর দিয়ে আগলে রেখেছিলেন সন্তানকে।
উদ্ধারকর্মীরা যখন তাদের কাছে পৌঁছান, তখন ওই বাবা চরম আকুতি জানিয়ে বলছিলেন যেন তার সন্তানকে বাঁচানো হয়। এছাড়া ফিসফিস শব্দ শুনে আরেকটি নবজাতককে উদ্ধার করা হয়, যার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বর্ণ পরিবর্তন হয়েছিল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং উদ্ধারকাজ ত্বরান্বিত করতে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা দেশজুড়ে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহর কালিতে সম্ভাব্য লুটপাট ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে সান্ধ্য আইন বা কারফিউ জারি করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তবে চোকোর প্রত্যন্ত ওয়ুনান আদিবাসী অঞ্চলের বুয়েনাভিস্তা সংরক্ষিত এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ ও সহায়তা পৌঁছাতে না পারায় মানবিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। আদিবাসী নেতারা জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধের দাবি জানিয়েছেন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর সংহতি প্রকাশ করেছেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্যাটেলাইট সেবা ও আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসন ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের জরুরি তহবিল অনুমোদন করেছে। পাশাপাশি স্পেন, ইকুয়েডর, ব্রাজিল ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলো উদ্ধারকাজে সহযোগিতার প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এদিকে মূল ভূকম্পনের পর ৭০টিরও বেশি পরাঘাত অনুভূত হওয়ায় আতঙ্কিত হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে এখনো খোলা আকাশের নিচে ও পার্কের মাঠে রাত কাটাচ্ছেন। নিখোঁজ হাজারও মানুষকে উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চলে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








