নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:১৮, ১২ আগস্ট ২০২৬
আপডেট: ১৭:১৫, ১২ আগস্ট ২০২৬

সন্ধ্যা থেকে কমতে পারে লোডশেডিং: প্রতিমন্ত্রী

সন্ধ্যা থেকে কমতে পারে লোডশেডিং: প্রতিমন্ত্রী

ছবি: সংগৃহীত

দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটের মধ্যে বুধবার সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তবে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দিতে পারেননি তিনি। বঙ্গোপসাগরের বৈরী আবহাওয়ার কারণে মহেশখালীর সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে একটি কার্গো খালাস করা যাচ্ছে না। 

অন্যদিকে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি কারিগরি সমস্যার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। দুটি সংকট একসঙ্গে তৈরি হওয়ায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে পল্লি অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। 

পরিস্থিতি নিয়ে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছানোর কথা স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী বুধবার (১২ আগস্ট) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের হাতে থাকা সব বিকল্প নিয়ে কাজ চলছে।

সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক উন্নতির জন্য সরকার গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই একটি কৌশল বাস্তবায়ন শুরু করেছে। সেই কৌশলের সুফল বুধবার সন্ধ্যা থেকে কিছুটা পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছেন তিনি। তবে এই উন্নতি যে পুরো সংকটের অবসান নয়, সেটিও স্পষ্ট করেছেন প্রতিমন্ত্রী। 
আরও পড়ুন: রেলওয়ের জন্য ভারত থেকে আসছে ১৯ নতুন কোচ

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি কবে নাগাদ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হবে, দিনক্ষণ বেঁধে তা বলা কঠিন। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের সরবরাহের একটি বড় অংশ এখন দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল এবং সামিট টার্মিনালের ক্ষেত্রে সরবরাহ স্বাভাবিক করার বিষয়টি সরাসরি সমুদ্রের আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে। বৈরী আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে আটকে থাকা এলএনজি কার্গো খালাস করা সম্ভব হবে এবং জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ বাড়বে বলে আশা করছে সরকার।

বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মহেশখালীর দুটি ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ। বাংলাদেশে আমদানি করা এলএনজি জাহাজ থেকে গ্রহণ করে রিগ্যাসিফিকেশনের মাধ্যমে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করার ক্ষেত্রে এই দুটি টার্মিনাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে একটি পরিচালনা করে সামিট, অন্যটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি। সাম্প্রতিক সময়ের আগে এই দুই টার্মিনাল মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার সক্ষমতা ছিল। এক্সিলারেটের টার্মিনালের সক্ষমতা প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে এক্সিলারেটের টার্মিনালটি বয়লারজনিত সমস্যার কারণে প্রায় ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে বলে প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন। অর্থাৎ একদিকে সামিটের টার্মিনালে কার্গো খালাস আটকে আছে, অন্যদিকে এক্সিলারেটও পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস দিতে পারছে না। ফলে গ্যাসের সরবরাহে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।

এক্সিলারেট টার্মিনালকে আবার পূর্ণ সক্ষমতায় নিতে হলে প্রায় ৭২ ঘণ্টা সেটি বন্ধ রেখে প্রয়োজনীয় কাজ করতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। কিন্তু বিদ্যুৎ ও গ্যাসের তীব্র সংকটের মধ্যে একবারে তিন দিন টার্মিনালটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এখন টার্মিনালটি ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় হলেও কিছু গ্যাস সরবরাহ করছে; সেটি পুরোপুরি বন্ধ করলে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে এবং তার প্রভাব বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য গ্রাহকের ওপর পড়তে পারে। এ কারণে কখন টার্মিনালটি বন্ধ রাখলে জনদুর্ভোগ তুলনামূলক কম হবে, তা নিয়ে এক্সিলারেট এনার্জির কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে সরকার। প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ শেষ করে টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা গেলে সংকট মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগে বিভিন্ন সময় ৭২ ঘণ্টা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ রাখার ঘটনায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার নজিরও রয়েছে।

অন্যদিকে সামিটের টার্মিনালের সামনে তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সমস্যা। বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় টার্মিনালসংলগ্ন এলাকায় অপেক্ষমাণ এলএনজি কার্গো থেকে গ্যাস খালাস করা যাচ্ছে না। ফলে কার্গোটি সমুদ্রে অপেক্ষা করলেও তা জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে যুক্ত হতে পারছে না। 

আরও পড়ুন: চার দিনের স্বস্তি শেষে দেশজুড়ে আবার গ্যাস সংকট

প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রকৃতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে কার্যত কিছু করার নেই। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হলে দ্রুত কার্গো খালাস করে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে। অর্থাৎ বর্তমান সংকটের একটি অংশ কারিগরি ও ব্যবস্থাপনাগত হলেও আরেকটি বড় অংশ সরাসরি বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সময় নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না সরকার।

গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত পড়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হলে কেন্দ্রগুলোর অনেকগুলোকে আংশিক সক্ষমতায় চালাতে হয়, কোনো কোনো কেন্দ্রকে বন্ধও রাখতে হয়। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয় এবং সেই ঘাটতি পূরণে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হয়। গত জুনের শেষভাগেও দেশে লোডশেডিং তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি, কারিগরি ত্রুটি ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। সাম্প্রতিক সংকট সেই সমস্যার সঙ্গে নতুন করে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি যুক্ত করেছে। ফলে বিশেষ করে গ্রাম ও পল্লি এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ বেড়েছে। কোথাও কোথাও গ্রাহকদের ক্ষোভ বিদ্যুৎ অফিস, উপকেন্দ্র কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ওপর হামলা ও হুমকির পর্যায়েও পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক সময়ে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় বিদ্যুৎ কার্যালয়ে হামলা, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে উপকেন্দ্রে ঢুকে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা এবং শেরপুরে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের হুমকির অভিযোগের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনায় পল্লি বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিরাপত্তা চেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা চেয়েছেন।

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত অবশ্য বলেছেন, জনরোষের কারণে তার মন্ত্রণালয় পুলিশকে কোনো চিঠি দেয়নি; নিরাপত্তার বিষয়ে পল্লি বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজস্ব বিবেচনায় ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে গ্রাহকদের ক্ষোভ যে বাড়ছে, তার প্রতিফলন বিভিন্ন জেলার ঘটনাতেই স্পষ্ট। বিদ্যুৎ না থাকায় শুধু গৃহস্থালি জীবন নয়, কৃষি সেচ, ছোট ব্যবসা, দোকানপাট, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং স্থানীয় শিল্পকারখানার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনদুর্ভোগ আরও তীব্র হচ্ছে। ফলে সরকার যে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি করতে চাইছে, তার পেছনে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি মোকাবিলার পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতা কমানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংকট মোকাবিলায় সরকার শুধু অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের উদ্যোগও নিয়েছে। মালয়েশিয়ার কাছ থেকে অন্তত একটি এলএনজি কার্গো পাওয়ার আশা করছে সরকার। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে চিঠি দিয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা চেয়েছিলেন। পরে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ফোনালাপও হয়। মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশ কীভাবে সহায়তা পেতে পারে তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়। 

প্রতিমন্ত্রীর সর্বশেষ বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি একটি প্রতিনিধি দল মালয়েশিয়ায় গিয়ে দেশটির দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে এবং অন্তত একটি কার্গো এলএনজি পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। সরকার এটিকে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে দেখছে।

এলএনজি সংগ্রহের ক্ষেত্রে আইএসও ট্যাংক ব্যবহারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে তরলীকৃত এলএনজি বিশেষায়িত কনটেইনার বা ট্যাংকের মাধ্যমে পরিবহন করা সম্ভব হলেও প্রয়োজনীয় আইএসও ট্যাংকের প্রাপ্যতা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং পুরো প্রক্রিয়া প্রস্তুত করতে সময় লাগে। ফলে এটিকে তাৎক্ষণিকভাবে বড় পরিমাণ গ্যাসের ঘাটতি পূরণের সহজ সমাধান হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। 

প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাজারে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইএসও ট্যাংক পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটিও একটি বাস্তব সমস্যা। এ কারণে সরকার এটিকে মধ্যমেয়াদি বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে এবং একই সঙ্গে হাতে থাকা অন্যান্য সব পথ খোলা রাখছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির কাঠামো ইতোমধ্যে বহুমুখী হলেও আমদানিনির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজার, সরবরাহকারীদের সক্ষমতা এবং স্পট মার্কেটের পরিস্থিতির ওপর দেশের গ্যাস সরবরাহ অনেকটাই নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ মোট ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে কাতার এনার্জির ৪০ কার্গো, ওমানের ওকিউটির ১৬ কার্গো, কাতার এনার্জি ট্রেডিংয়ের ১২ কার্গো, ওকিউ ট্রেডিংয়ের চার কার্গো এবং এক্সিলারেট গ্যাস মার্কেটিংয়ের ১৪ কার্গো সরবরাহ করার কথা ছিল; পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি চুক্তি ও স্পট মার্কেট থেকেও কার্গো সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সময়ে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে ২০২৬ সাল থেকে ২০৩৯ সাল পর্যন্ত ৭৮ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। এসব উদ্যোগ দেখাচ্ছে, বর্তমান সংকট তাৎক্ষণিকভাবে মোকাবিলা করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের সরবরাহ ঝুঁকি কমাতেও সরকারকে নতুন করে পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।

তবে বিদ্যমান সংকটকে শুধু সামিট বা এক্সিলারেটের টার্মিনালের সাময়িক সমস্যার ফল হিসেবে দেখছেন না প্রতিমন্ত্রী। তাঁর দাবি, দেশের জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা ও পর্যাপ্ত মধ্যমেয়াদি-দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, আগের সরকারগুলো তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেওয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে; ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পর্যাপ্ত দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে কোনো এক সময় এমন সংকটের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়ার কথা ছিল এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটি এবার গ্রীষ্মকালেই প্রকট হয়েছে। তবে এটি প্রতিমন্ত্রীর রাজনৈতিক মূল্যায়ন; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কাঠামোগত কারণ বিশ্লেষণে গ্যাসের দেশীয় উৎপাদন, আমদানিনির্ভরতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি প্রাপ্যতা, এলএনজি টার্মিনালের নির্ভরযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর কাজও চলছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন কূপ খননের মাধ্যমে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে আরও ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশীয় উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। ফলে বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য এলএনজি আমদানি ও বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারই বাস্তবসম্মত পথ। অন্যদিকে নতুন দেশীয় গ্যাস উৎপাদন, নতুন সরবরাহ চুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একদিকে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, অন্যদিকে গ্যাস সরবরাহের সীমিত সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। এক্সিলারেট টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় নিতে গেলে ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখার প্রয়োজনীয়তা এবং একই সময়ে সামিট টার্মিনালে আবহাওয়ার কারণে এলএনজি কার্গো খালাস বন্ধ থাকা দুটি বিষয়কে সমন্বয় করেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, বিশেষজ্ঞ ও টার্মিনাল পরিচালনাকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে এমন সময় নির্ধারণের চেষ্টা চলছে, যখন রক্ষণাবেক্ষণের কারণে টার্মিনাল বন্ধ রাখলেও জনদুর্ভোগ তুলনামূলক কম হবে। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে এবং গণমাধ্যম থেকেও বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ থাকলে তা বিবেচনার কথা জানিয়েছেন তিনি।

সব মিলিয়ে বুধবার সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির যে আশা প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, তা মূলত সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নেওয়া সাময়িক কৌশল ও সীমিত গ্যাসকে সর্বোচ্চ কার্যকরভাবে ব্যবহারের ওপর নির্ভর করছে। এটি লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘোষণা নয়। সামিট টার্মিনালে এলএনজি কার্গো খালাস, এক্সিলারেট টার্মিনালের পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরে আসা, বিকল্প উৎস থেকে নতুন এলএনজি কার্গো সংগ্রহ এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ এই কয়েকটি ধাপের অগ্রগতির ওপরই সংকট কত দ্রুত কাটবে তা নির্ভর করবে। প্রতিমন্ত্রীও নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে না চেয়ে বলেছেন, জনদুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে এবং হাতে থাকা কোনো বিকল্পই বাদ দেওয়া হচ্ছে না। ফলে বুধবার সন্ধ্যায় কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের জন্য তাৎক্ষণিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি অবকাঠামোর সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি পরিকল্পনাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়