নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:৩১, ১১ আগস্ট ২০২৬

চার দিনের স্বস্তি শেষে দেশজুড়ে আবার গ্যাস সংকট

চার দিনের স্বস্তি শেষে দেশজুড়ে আবার গ্যাস সংকট

ছবি: সংগৃহীত

দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আবারও নাজুক হয়ে পড়েছে। মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডের পর আংশিকভাবে সরবরাহ শুরু হওয়ায় মাত্র চার দিনের জন্য কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন এলএনজি কার্গো টার্মিনালে সংযুক্ত করা না যাওয়ায় আবারও সরবরাহ কমে গেছে। একপর্যায়ে দৈনিক প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে ওঠা এলএনজি সরবরাহ এখন নেমে এসেছে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। 

ফলে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) থেকে সারাদেশে গ্যাসের চাপ আরও কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এক্সিলারেটের ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরাতে আবার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার প্রয়োজন হলে সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে মূল সংকটটি তৈরি হয় গত ২১ জুলাই। ওই দিন কক্সবাজারের মহেশখালীর উপকূলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিটে (এফএসআরইউ) এলএনজি সরবরাহ-সংক্রান্ত কার্যক্রমের সময় কারিগরি ত্রুটি ও পরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ, নিয়ন্ত্রণ ও ইন্সট্রুমেন্টেশন ব্যবস্থার একাধিক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়।

অগ্নিকাণ্ডের পরপরই সংকটের মাত্রা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মহেশখালীর দুটি এফএসআরইউর একটি অচল হয়ে পড়ায় আমদানি করা এলএনজির সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আবাসিক, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন খাতে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যায়, অনেক এলাকায় রান্নার চুলা জ্বালানো কঠিন হয়ে পড়ে। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও সরবরাহ সীমিত হয়ে যায় এবং কোথাও কোথাও যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। শিল্পকারখানাগুলোও উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সমস্যায় পড়ে।

প্রথম দিকে টার্মিনালটি কবে স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। স্থানীয় প্রকৌশলীরা ত্রুটির কারণ শনাক্ত ও সমাধানে কাজ করলেও পরে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হয়। 

কর্মকর্তারা জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহের পাশাপাশি টার্মিনালের নিরাপদ পুনঃচালনার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশের কিছু অংশ বিদেশ থেকে আনার প্রক্রিয়াও দ্রুততর করা হয়।

মহেশখালীতে বাংলাদেশের এলএনজি অবকাঠামোর কেন্দ্রীয় ভূমিকা থাকায় একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার প্রভাব পুরো জাতীয় গ্যাস ব্যবস্থায় পড়ে। বর্তমানে সেখানে সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। সামিটের টার্মিনালের দৈনিক সর্বোচ্চ সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এক্সিলারেটের সক্ষমতা প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ দুটি টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চললে দৈনিক প্রায় ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার সামর্থ্য রয়েছে। কিন্তু এক্সিলারেটের টার্মিনাল বিপর্যয়ের পর সামিটকে অতিরিক্ত চাপ নিয়ে সরবরাহ ধরে রাখতে হয়।

এক্সিলারেটের টার্মিনালের দুটি বয়লারের প্রতিটির সক্ষমতা প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অগ্নিকাণ্ডে একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অক্ষত বয়লারটি ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে সরবরাহ পুনরায় শুরু করা হয়। প্রায় দুই সপ্তাহের অচলাবস্থার পর একটি ইউনিট চালু হলে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কিছুটা বাড়ে এবং গ্যাস সংকট পুরোপুরি না কাটলেও পরিস্থিতিতে সাময়িক স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ওই টার্মিনাল থেকে দিনে গড়ে প্রায় ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল।

এর মধ্যেই নতুন করে সমস্যায় পড়েছে সামিটের সরবরাহ ব্যবস্থা। সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজ থেকে টার্মিনালে কার্গো সংযুক্ত বা খালাসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। 

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তাল সমুদ্রের কারণে সামিটের এফএসআরইউর সঙ্গে নতুন কার্গোর বার্থিং বা সংযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি। ফলে কয়েক দিন আগে বাড়তে শুরু করা এলএনজি সরবরাহ আবার কমে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। 

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি সরবরাহ কমেছে এবং সমুদ্র পরিস্থিতির উন্নতি হলে বুধবার থেকে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আরও পড়ুন: রেকর্ড লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত দেশ: জ্বালানি সংকটে অন্ধকারে জনজীবন

এতে গ্যাসের সামগ্রিক সরবরাহ-চিত্রও দ্রুত বদলে গেছে। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পেট্রোবাংলা প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করে থাকে। এর মধ্যে এলএনজি থেকে আসে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট। এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর সামিটকে সর্বোচ্চ সক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে সরবরাহ করতে হয়েছে। একপর্যায়ে সামিট থেকে দৈনিক প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করা হলেও পরে তা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। এর সঙ্গে এক্সিলারেটের আংশিক সরবরাহ যোগ হয়ে মোট গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে ২৪৫ কোটি ঘনফুটের বেশি উঠেছিল। কিন্তু নতুন কার্গো টার্মিনালে নেওয়া না যাওয়ায় আবারও তা ২২০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অর্থাৎ অগ্নিকাণ্ডের কারণে তৈরি হওয়া ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার আগেই এবার সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়া নতুন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোকে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে আবাসিক গ্রাহকের পাশাপাশি শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি খাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জাতীয় গ্রিডে কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হলেই শুধু রান্নার চুলায় নয়, উৎপাদন ও পরিবহন খাতেও দ্রুত চাপ তৈরি হয়।

তবে বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে এক্সিলারেটের এফএসআরইউকে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া। মঙ্গলবার রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ আয়োজিত জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায় শীর্ষক সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউর একটি বয়লার দিয়ে বর্তমানে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কিন্তু দ্বিতীয় বয়লারটি সচল করার আগে চালু থাকা বয়লারটিও বন্ধ করে পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় কাজ করতে হবে। ফলে পুরো এফএসআরইউকে আবার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার প্রয়োজন হতে পারে।

এখন পর্যন্ত ওই কাজ ঠিক কবে শুরু হবে, তা নিশ্চিত করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু ও পুরো সিস্টেম পুনরায় স্বাভাবিক করতে গেলে কিছু সময়ের জন্য বর্তমান আংশিক সরবরাহও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর আগে এক্সিলারেটের টার্মিনাল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমেছিল। ফলে এবার মেরামত ও পরীক্ষার সময় একই ধরনের ধাক্কা এড়াতে সময় নির্বাচন, বিকল্প সরবরাহ এবং চাহিদা ব্যবস্থাপনা নিয়ে জ্বালানি বিভাগের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটি বয়লারের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হলেও পুরো এফএসআরইউকে সক্ষমতায় ফেরাতে বর্তমান চালু বয়লারটিও বন্ধ রাখতে হবে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। অর্থাৎ এখন যে সীমিত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও মেরামতের পরবর্তী ধাপে সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে ছুটির দিনে বা তুলনামূলক কম চাহিদার সময়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

গ্যাস সংকটের এই পরিস্থিতি শুধু সরবরাহ অবকাঠামোর কারিগরি দুর্বলতাকেই সামনে আনেনি; একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকিও স্পষ্ট করেছে। দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন দিয়ে মোট চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে একটি এফএসআরইউতে কারিগরি সমস্যা, জাহাজ থেকে কার্গো খালাসে বিঘ্ন কিংবা সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়া যেকোনো একটি কারণ জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলছে। চলতি বছরও চাহিদা মেটাতে স্পট মার্কেটসহ বিভিন্ন উৎস থেকে একাধিক এলএনজি কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এই বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়টিও সামনে এসেছে। 

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে বড় পরিসরের নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে একটি বিদেশি বেসরকারি উদ্যোক্তা গোষ্ঠী আগ্রহ দেখিয়েছে। ওই গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা সরকারের সঙ্গে বৈঠকও করেছে। সরকার তাদের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিতে বলেছে। প্রস্তাব পাওয়ার পর প্রকল্পটির কারিগরি, আর্থিক ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দিক পরীক্ষা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

নতুন এফএসআরইউ প্রকল্প নিয়েও সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বেসরকারি কোম্পানির প্রকল্প সরাসরি অনুমোদন দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো, নতুন প্রকল্পটি সরকার-টু-সরকার বা জিটুজি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের দিকে এগোনো। এ ক্ষেত্রে অন্য দেশের সরকার বা সরকার-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ থাকে। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্যায়ন করে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং সেই তালিকা ধরে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজন বিবেচনায় জিটুজি পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে বিস্তারিত প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাব পাওয়ার পর দরকষাকষি ও মূল্যায়নের মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আলোচনা সন্তোষজনক হলে তবেই চুক্তির পর্যায়ে যাওয়া হবে। তবে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশের স্বার্থের সঙ্গে আপস করা হবে না বলেও প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন।

বর্তমান সংকট তাই তাৎক্ষণিকভাবে একটি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা কিংবা সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়ার ফল হলেও এর গভীরে রয়েছে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। চাহিদার তুলনায় দেশীয় উৎপাদন কম, এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি এবং আমদানি করা গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার ক্ষেত্রে মাত্র দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। ফলে একটি টার্মিনাল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে অন্যটির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে; আর সেই টার্মিনালেও কার্গো সংযোগ বা আবহাওয়াজনিত সমস্যা দেখা দিলে পুরো ব্যবস্থায় সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হয়।

২১ জুলাইয়ের অগ্নিকাণ্ডের পর গত তিন সপ্তাহে সেই ঝুঁকির বাস্তব চিত্র একাধিকবার দেখা গেছে। প্রথমে এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে সরবরাহ কমেছে, পরে সামিট অতিরিক্ত সরবরাহ দিয়ে ঘাটতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে, এরপর এক্সিলারেট আংশিক চালু হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। কিন্তু সেই স্বস্তি টেকেনি মাত্র চার দিনের মধ্যে সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন কার্গো টার্মিনালে নেওয়া না যাওয়ায় এলএনজি সরবরাহ আবার কমেছে। সামনে ক্ষতিগ্রস্ত বয়লার পুরোপুরি সচল করতে এক্সিলারেটের এফএসআরইউ আবার বন্ধ রাখতে হলে সংকটের আরেকটি বড় ধাক্কা আসতে পারে।

এ অবস্থায় বুধবার সমুদ্রের পরিস্থিতির উন্নতি এবং নতুন এলএনজি কার্গো টার্মিনালে সংযুক্ত করা সম্ভব হয় কি না, সেটিই এখন স্বল্পমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশি এক্সিলারেটের ক্ষতিগ্রস্ত বয়লার কত দ্রুত নিরাপদে চালু করা যায় এবং মেরামতের সময় জাতীয় গ্রিডে বিকল্প সরবরাহ কতটা ধরে রাখা সম্ভব হবে তার ওপরও নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের গ্যাস পরিস্থিতি। আর দীর্ঘমেয়াদে নতুন টার্মিনাল স্থাপন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানি অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই একক-নির্ভরতা কমানো না গেলে সাময়িক সমাধানের পরও একই ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়