বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে মার্কেট বন্ধ রাত ৮টায়, ৭টায় বিলবোর্ড
ছবি: সংগৃহীত
বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় চাপ কমাতে শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট খোলা রাখার সময় আবারও কমিয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের সব শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে। একই সঙ্গে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ করতে হবে এবং আলোকসজ্জা ও লাইটিং সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলমান ও অনুষ্ঠেয় মেলা, বাণিজ্য মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও রাত ৮টার মধ্যে শেষ করতে হবে। নতুন এই নির্দেশনা আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) থেকে কার্যকর হবে।
বুধবার (১২ আগস্ট) রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়-২ শাখা থেকে জারি করা স্মারকে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব মো. মামুন ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন, প্রশাসন, ব্যবসায়ী সংগঠন ও অন্যান্য দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েবসাইটেও মো. মামুন ভূঁইয়াকে উপসচিব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার সময়সীমায়। এতদিনের ব্যবস্থায় শপিংমল, বিপণিবিতান, মার্কেট ও দোকানপাট বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ ছিল। ১১ জুন ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আগের সীমিত সময়সূচি শিথিল করে এই সময় বাড়িয়েছিল। ওই সময়সূচি অনুযায়ী ১২ জুন থেকে দেশের শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চালু রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।
এবার বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন বিবেচনায় সেই সময়সীমা আবার এক ঘণ্টা কমিয়ে রাত ৮টা করা হলো। অর্থাৎ নতুন নিয়মে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দিনের হিসাবে মোট নয় ঘণ্টা বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখতে পারবে। রাত ৮টার পর শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধ রাখতে হবে।
শুধু দোকানপাটের ক্ষেত্রেই নয়, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নতুন নির্দেশনায় জনসমাগম ও বাণিজ্যিক আয়োজনের সময়ও সীমিত করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান এবং অনুষ্ঠেয় মেলা, বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যে শেষ করতে হবে। ফলে এসব আয়োজনের আয়োজক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান সমাপ্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
এর পাশাপাশি সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন স্থাপনা, মার্কেট, বিপণিবিতান কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত আলোকসজ্জা ও অন্যান্য সাজসজ্জার আলো সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। অর্থাৎ দোকানপাট রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ থাকলেও বিজ্ঞাপন ও সৌন্দর্যবর্ধনমূলক আলোকসজ্জা সন্ধ্যা ৭টার পর চালু রাখা যাবে না। বিদ্যুৎ বিভাগের সর্বশেষ নির্দেশনায় এই বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকে এই সময়সীমার আওতায় আনা হয়নি। জরুরি সেবা এবং মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এ নির্দেশনার বাইরে থাকবে। এর মধ্যে খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসি এবং জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে জরুরি সেবা অব্যাহত রাখার স্বার্থে নির্ধারিত সময়সীমার সাধারণ বিধিনিষেধ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: ৮০ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে চিঠি
নতুন সিদ্ধান্তটি হঠাৎ করে আসেনি; চলতি বছর বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দোকানপাট ও বিপণিবিতানের সময়সূচিতে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। জুনের শুরুতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ঈদের ছুটি শেষে শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাটের সময় আগের সীমিত সূচিতে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সে সময় সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার নির্দেশনা কার্যকর করা হয় এবং একই সঙ্গে বিলবোর্ডের বাতি ও বিভিন্ন মেলা, বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তবে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সময় বাড়ানোর দাবি ওঠে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার পর ১১ জুন সরকার আবার সময়সূচি শিথিল করে। নতুন সিদ্ধান্তে ১২ জুন থেকে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দোকানপাট, মার্কেট ও শপিংমল খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির পক্ষ থেকেও সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর নতুন সময়সূচির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে সেই সময় আবার এক ঘণ্টা কমিয়ে আনার ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় নতুন করে সমন্বয় করতে হবে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর কেনাকাটার ওপর নির্ভরশীল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শপিংমল ও মার্কেটগুলোকে এখন রাত ৮টার মধ্যেই বেচাকেনা শেষ করে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে মার্কেট ও বিপণিবিতান কর্তৃপক্ষকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড ও আলোকসজ্জা বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সর্বশেষ নির্দেশনার মূল লক্ষ্য শুধু দোকানপাট দ্রুত বন্ধ করা নয়; বরং সন্ধ্যা ও রাতের বিদ্যুৎ চাহিদার ওপর চাপ কমিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর রাখা। বাণিজ্যিক এলাকায় একই সময়ে বিপুলসংখ্যক দোকান, শপিংমল, সাইনবোর্ড, আলোকসজ্জা ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালু থাকায় ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। নতুন সময়সূচির মাধ্যমে সেই অতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও সরকার নতুন পদক্ষেপকে বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছে।
এ ক্ষেত্রে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বিলবোর্ড ও আলোকসজ্জা বন্ধের সিদ্ধান্তটিও গুরুত্বপূর্ণ। দোকানপাট বন্ধ হওয়ার এক ঘণ্টা আগেই এসব আলো বন্ধ করার নির্দেশের ফলে বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে বড় শপিংমল, মার্কেট, সড়কের পাশের আলোকিত বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনার সাজসজ্জার আলো বন্ধ রাখলে সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি অংশ কমানো সম্ভব হবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নয়। সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী সমিতি এবং অন্যান্য দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের পর দোকানপাট চালু রাখা কিংবা আলোকিত বিলবোর্ড ও আলোকসজ্জা চালু রাখার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নজরদারি করতে হবে।
চলতি বছরের সময়সূচি পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা দেখলে বোঝা যায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সরকার পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সময় সমন্বয় করছে। জুনের শুরুতে সময় আরও কঠোর করা হয়েছিল, পরে ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রাত ৯টা পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে আবার রাত ৮টার সীমা নির্ধারণ করা হলো। অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের জন্য আগের রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগটি এক ঘণ্টা কমিয়ে নতুন করে বিদ্যুৎ সাশ্রয়মূলক সময়সূচি কার্যকর করা হচ্ছে।
নতুন নির্দেশনায় তাই একসঙ্গে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকানপাট ও শপিংমল চালু রাখা, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ করা, সব ধরনের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা এবং মেলা, বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যে শেষ করা। এর বাইরে জরুরি সেবা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালু থাকবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষকে নতুন সময়সূচি যথাযথভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে। ফলে আগামী ১৩ আগস্ট থেকে দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কার্যকর হতে যাওয়া নতুন সূচিতে রাত ৮টার পর শপিংমল, মার্কেট ও সাধারণ দোকানপাট খোলা রাখা যাবে না। একই সঙ্গে সন্ধ্যা ৭টার পর আলোকিত বিজ্ঞাপন ও আলোকসজ্জা বন্ধ রাখতে হবে। সরকারের প্রত্যাশা, এভাবে বাণিজ্যিক ও অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








