নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:৩৫, ১১ আগস্ট ২০২৬

সরকারি নিয়োগে প্রক্সি ঠেকাতে বায়োমেট্রিকসহ ১২ দফা নির্দেশনা

সরকারি নিয়োগে প্রক্সি ঠেকাতে বায়োমেট্রিকসহ ১২ দফা নির্দেশনা

ফাইল ছবি

সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের অপব্যবহারসহ সব ধরনের অসদুপায় রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি জারি করা এক নির্দেশনায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব, সচিব, বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো এই নির্দেশনায় নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার ওপর সর্বাধিক জোর দেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, অধিদপ্তর ও সংস্থায় নিয়োগ কার্যক্রমে একশ্রেণির অসাধু চক্র নানা অনৈতিক উপায় অবলম্বন করে আসছে। নিজেদের পরিবর্তে অন্যের মাধ্যমে লিখিত, ব্যবহারিক এমনকি মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্ষুদ্রাকৃতির ব্লুটুথ ডিভাইস এবং বিভিন্ন ডিজিটাল ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম। এর ফলে প্রকৃত ও মেধাবী প্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং অযোগ্য প্রার্থীরা চাকরির সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন, যা পুরো নিয়োগ ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। এই প্রেক্ষাপটে সার্বিক শৃঙ্খলা ফেরাতে ১২ দফার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে।

১. সাম্প্রতিক ছবি বাধ্যতামূলক: প্রার্থীর আবেদনপত্র জমাদানের তারিখের ঠিক এক মাস বা তার মধ্যে তোলা স্পষ্ট ও সাম্প্রতিক রঙিন ছবি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

২. লিখিত পরীক্ষার পূর্বে স্ক্রিনিং: লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠানের আগেই প্রার্থীদের আবেদনপত্রগুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে।

৩. প্রবেশদ্বারে কঠোর তল্লাশি ও ইলেকট্রনিক্স নিষিদ্ধকরণ: পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের সময় পরীক্ষার্থীরা কোনো ধরনের মোবাইল ফোন, ক্যালকুলেটর, ডিজিটাল হাতঘড়ি, ক্ষুদ্রাকৃতির ব্লুটুথ ডিভাইস, ব্যাগ বা বই-পুস্তক সঙ্গে নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় সহায়তায় প্রবেশগেটে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশি চালাতে হবে।

৪. নির্ধারিত সময়ে প্রবেশ কড়াকড়ি: পরীক্ষা শুরু হওয়ার নির্ধারিত সময়ের পর কোনো অবস্থাতেই কোনো পরীক্ষার্থীকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না।

৫. কক্ষ পরিদর্শকদের জন্য ডিভাইস নিষেধাজ্ঞা: পরীক্ষা চলাকালীন কক্ষের ভেতরে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো পরিদর্শক বা কর্মকর্তা মোবাইল ফোন কিংবা অন্য কোনো ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করতে পারবেন না।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি নিতে চায় এস্তোনিয়া

৬. ছবি ও রোল নম্বর যাচাই: প্রবেশপত্র ও হাজিরা শিটে থাকা ছবির সঙ্গে পরীক্ষার্থীর প্রকৃত চেহারা এবং রোল নম্বর ভালোভাবে মিলিয়ে দেখার পরই কেবল কক্ষ পরিদর্শকরা উত্তরপত্রে স্বাক্ষর করবেন। কোনো ধরনের অসঙ্গতি বা সন্দেহজনক কিছু দেখা মাত্রই তাৎক্ষণিকভাবে তা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করতে হবে।

৭. হাতের লেখা যাচাইকরণ: মৌখিক বা ভাইভা পরীক্ষার সময় প্রার্থীর প্রবেশপত্র, লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র এবং প্রার্থীর বর্তমান হাতের লেখার মধ্যে মিল আছে কি না তা যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডে প্রার্থীর কাছ থেকে পুনরায় সংক্ষিপ্ত আকারে লেখা নিয়ে তা উত্তরপত্রের লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

৮. লিখিত পরীক্ষায় ছবি ধারণ: সম্ভব হলে লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রতিটি প্রার্থীর ছবি ডিজিটাল মাধ্যমে ধারণ করে সংরক্ষণ করতে হবে, যা পরবর্তীতে ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষার সময় ক্রস-চেক করতে কাজে লাগবে।

৯. ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষার ছবি সংরক্ষণ: ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সকল প্রার্থীর ছবি বাধ্যতামূলকভাবে তুলে রাখতে হবে। পরবর্তীতে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থী যখন চাকরিতে যোগদান করতে আসবেন, তখন সংরক্ষিত সেই ছবির সঙ্গে প্রার্থীর অবয়ব মিলিয়ে দেখার পরই যোগদানপত্র গ্রহণ করা হবে।

১০. গোয়েন্দা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তা: পরীক্ষার গোপনীয়তা রক্ষা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁক বা জালিয়াতি রোধ করতে পরীক্ষা শুরুর আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাঠপর্যায়ের সহায়তা নিতে হবে।

১১. মোবাইল কোর্ট ও সামারি ট্রায়াল পরিচালনা: যেকোনো ধরনের অনিয়ম ও অসদুপায় রুখতে পরীক্ষাকেন্দ্রে বা এর আশেপাশের এলাকায় মোবাইল কোর্ট বা সামারি ট্রায়াল পরিচালনার জন্য আগে থেকেই সার্বিক প্রস্তুতি রাখতে হবে। কোনো পরীক্ষাকেন্দ্রে ভুয়া বা প্রক্সি পরীক্ষার্থী কিংবা কোনো জালিয়াতি চক্র ধরা পড়লে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল কোর্ট, সামারি ট্রায়াল বা নিয়মিত ফৌজদারি মামলা করতে হবে।

১২. বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণসহ প্রযুক্তির ব্যবহার: ভুয়া বা প্রক্সি পরীক্ষার্থী চিরতরে প্রতিরোধ করতে পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ ও মুখাবয়ব) শনাক্তকরণ ব্যবস্থাসহ আধুনিক প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো তাদের অধীনস্থ সকল অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে এই নির্দেশনা কঠোরভাবে পৌঁছে দেবে। শুধু নির্দেশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ নয়, বরং পরীক্ষা চলাকালীন যেকোনো ধরনের অনিয়ম এড়াতে কার্যকর ও সক্রিয় ভিজিল্যান্স টিম বা নজরদারি দল গঠন করে সার্বিক বিষয়টি তদারকি করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্দেশনাগুলোর যথাযথ এবং নিরপেক্ষ বাস্তবায়ন দেশের সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করে একটি স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্য পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়