নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:৩৭, ১০ আগস্ট ২০২৬

রেকর্ড লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত দেশ: জ্বালানি সংকটে অন্ধকারে জনজীবন

রেকর্ড লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত দেশ: জ্বালানি সংকটে অন্ধকারে জনজীবন

ছবি: নিউজবাংলাদেশ (এআই)

দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তীব্র গরমের মধ্যে একের পর এক নতুন রেকর্ড গড়ছে লোডশেডিং। মাত্র ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে আগের সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড হয়েছে। 

রবিবার (০৯ আগস্ট) বিকেল ৩টায় সারা দেশে ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের রেকর্ড হওয়ার পর একই দিন রাত ১টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। অর্থাৎ মাত্র ১০ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং আরও ৮৬ মেগাওয়াট বেড়েছে। শুধু রাত ১টিই নয়, এরপরও কয়েক ঘণ্টা ধরে লোডশেডিং ছিল তিন হাজার মেগাওয়াটের ওপরে। রাত ২টায় ৩ হাজার ৭৫১, রাত ৩টায় ৩ হাজার ৬৩৯, রাত ৪টায় ৩ হাজার ৪৬৩ এবং ভোর ৫টায় ৩ হাজার ৩৭২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। ফলে দিনের ব্যস্ত সময়ের পাশাপাশি গভীর রাত ও ভোরেও বিদ্যুৎ ঘাটতি অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের দিন-রাত মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রামাঞ্চলের মানুষ, যেখানে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরবাড়ির স্বাভাবিক জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেচ, ক্ষুদ্র শিল্প এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে।

লোডশেডিংয়ের সাম্প্রতিক এই ঊর্ধ্বগতি মূলত জ্বালানি সরবরাহের সংকট, কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহ হ্রাসের সম্মিলিত ফল। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা যেখানে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি, সেখানে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনে। 

পিডিবির হিসাবে, গ্যাস সংকটের কারণে স্বাভাবিক উৎপাদনের তুলনায় অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে। ১০ হাজার মেগাওয়াটের মতো গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও গতকাল বিকেল ৫টায় এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫৮৯ মেগাওয়াট। একইভাবে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতা থাকা তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকেও উৎপাদন হচ্ছে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতেও কয়লা সরবরাহ ও অন্যান্য সমস্যার কারণে স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। 

পিডিবির হিসাবে, কয়লা সংকট ও অন্যান্য কারণে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে অন্তত আরও এক হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ গ্যাস ও কয়লা সংকট মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াটের উৎপাদন ঘাটতিই বর্তমান ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।

এই সংকটের শুরুতে বড় ধাক্কা আসে কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে। ২১ জুলাই টার্মিনালটিতে কারিগরি ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের পর সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট বা ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। বাংলাদেশে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট। একটি টার্মিনাল অচল হয়ে যাওয়ায় আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে যায় এবং আগে থেকেই চাহিদা-সরবরাহের ঘাটতিতে থাকা গ্যাস ব্যবস্থা আরও চাপে পড়ে। 

বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই সময় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, আবাসিক গ্রাহক ও সিএনজি স্টেশন সব খাতেই সংকট তীব্র হয়।

আরও পড়ুন: গ্যাসের সমস্যায় ১২ ঘণ্টা অন্ধকারে দেশ

টার্মিনালটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংকট দ্রুত কাটেনি। মেরামতের জন্য বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে সরকার দ্রুত অনুমোদনের ব্যবস্থা নেয় এবং ফিনল্যান্ড, স্পেন ও তুরস্ক থেকে যন্ত্রাংশ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ৫ আগস্ট রাতে টার্মিনালটি থেকে আংশিক গ্যাস সরবরাহ শুরু হলেও তা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরেনি। রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় দেশের দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ৭৫ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে তা প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত থাকত। 

সংশ্লিষ্টদের আশা, সবকিছু ঠিক থাকলে ১০ আগস্ট রাত ১১টার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে পূর্ণমাত্রায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে। তবে সেটি নিশ্চিত নয়। পূর্ণমাত্রায় সরবরাহ শুরু হলে জাতীয় গ্যাস ব্যবস্থায় দৈনিক সরবরাহ প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বাড়লে লোডশেডিং পরিস্থিতিরও কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের গ্যাস ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে শুধু একটি টার্মিনাল চালু হলেই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে এমন নিশ্চয়তা নেই।

গ্যাস সংকটের সঙ্গে এবার বড় ধাক্কা এসেছে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতেও। বিশেষ করে ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরবরাহ হঠাৎ করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমে গেছে। সাধারণ পিক আওয়ারে আদানি থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও রবিবার বিকেল ৫টায় সরবরাহ ছিল মাত্র ৮১৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ এক পর্যায়ে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে সরবরাহ। 

পিডিবির কাছে আদানি জানিয়েছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় কেন্দ্রটির কয়লার মজুত কমে গেছে এবং সে কারণে উৎপাদন কমাতে হয়েছে। তবে পিডিবি নিজে গিয়ে বিষয়টি যাচাই করতে পারেনি। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমার কারণ হিসেবে আপাতত আদানির দেওয়া তথ্যের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। এর পাশাপাশি কয়েকটি বড় দেশীয় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও উৎপাদন কম থাকায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

পায়রা, বড়পুকুরিয়া, মাতারবাড়ী, রামপাল, বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি, এসএস পাওয়ার এবং আরএনপিএলের মতো কেন্দ্রগুলোতেও বিভিন্ন সময় কয়লা সংকট, কারিগরি ত্রুটি কিংবা উৎপাদন সীমাবদ্ধতার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এক পর্যায়ে উৎপাদন নেমে আসে প্রায় ৭১০ মেগাওয়াটে। পায়রার একটি ইউনিট রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্ধ থাকার পর রাতে চালু হওয়ার খবর পাওয়া যায়। 

ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই ইউনিট থেকেও সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন হচ্ছে। একইভাবে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এসএস পাওয়ারের দুটি ইউনিট থেকে উৎপাদন ছিল প্রায় ১ হাজার ১৬৩ মেগাওয়াট। এর আগে জুনের শেষ দিকেও দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল বলে সংসদে জানিয়েছিলেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। একটি কেন্দ্রে বয়লার টিউব লিক এবং অন্যটিতে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাসে সমস্যা হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) হিসাবেও। রোববার বিকেল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় মাত্র ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট, যা তখন পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের নতুন রেকর্ড। বিকেল ৫টায় সরবরাহ কিছুটা বেড়ে প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট হলেও তখনও লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট। এরপর রাতের দিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। রাত ১টায় লোডশেডিং ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে উঠে যায়। এর আগে ৩ আগস্ট রাত ১টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট। তারও আগে ২৮ জুন রাত ২টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে সর্বোচ্চ ঘাটতির মাত্রা একাধিকবার ভেঙেছে। ২০২৩ সালের ৭ জুন বিকেল ৪টায় শেখ হাসিনা সরকারের সময় সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট। সেই রেকর্ডও এখন ছাড়িয়ে গেছে। জুনের শেষভাগেই গভীর রাতে লোডশেডিং তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। দেশের বহু এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। জুনের শেষ দিকেও গাজীপুরের বিভিন্ন উপজেলা ও শিল্পাঞ্চলে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার কথা জানিয়েছিলেন গ্রাহকেরা। চাঁদপুরেও শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হওয়ার তথ্য উঠে এসেছিল। বিদ্যুতের এই বৈষম্য নিয়ে সরকার আগেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। 

এপ্রিলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, গ্রামাঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে প্রয়োজনে শহরেও নিয়ন্ত্রিত লোডশেডিং দেওয়া হবে, যাতে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের বৈষম্য কমানো যায়। কিন্তু বর্তমান সংকটের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে সরবরাহ ঘাটতি শুধু গ্রামাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; রাজধানীর বাইরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এর প্রভাব পড়ছে।

লোডশেডিংয়ের এই সংকটকে শুধু বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না থাকায় সেই সক্ষমতার বড় অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বড় একটি অংশ কম গ্যাসে চলছে, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোয় কয়লা সরবরাহ ও কারিগরি সমস্যা রয়েছে, তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে তুলনামূলক বেশি খরচে উৎপাদন করতে হচ্ছে এবং একই সময়ে আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহও কমেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি। 

এর আগে পিডিবির গ্রীষ্মকালীন পরিকল্পনায় সতর্ক করা হয়েছিল, গ্যাস সরবরাহ ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে গেলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যেতে পারে। ওই পরিকল্পনায় কয়লা ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সম্ভাব্য উৎপাদনও তাদের মোট সক্ষমতার তুলনায় কম ধরা হয়েছিল।

ফলে বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এক ধরনের জ্বালানি-সরবরাহ সংকটের চক্রে পড়েছে। গ্যাস কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমছে; ঘাটতি পূরণে কয়লা ও তেলভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর চাপ বাড়ছে; কিন্তু সেসব কেন্দ্রেও পূর্ণমাত্রায় জ্বালানি বা উৎপাদন সক্ষমতা পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে বড় একটি আমদানি করা বিদ্যুৎ উৎস থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ভারসাম্য আরও দুর্বল হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের সামঞ্জস্য রাখতে বাধ্য হয়ে ব্যাপক লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পিজিসিবির হিসাবে যখন চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি এবং সরবরাহ প্রায় ১২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি থাকে, তখন কয়েক হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি সামাল দেওয়ার বাস্তব উপায় হয়ে দাঁড়ায় নিয়ন্ত্রিত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন এই সংকট কত দ্রুত কাটবে। এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনাল পূর্ণমাত্রায় চালু হলে গ্যাস সরবরাহে তাৎক্ষণিক কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু একই সময়ে আদানি কেন্দ্রের সরবরাহ কতটা দ্রুত স্বাভাবিক হবে, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে এবং গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারবে কি না এসবের ওপরই নির্ভর করবে পরিস্থিতির স্থায়িত্ব। অর্থাৎ একটি টার্মিনাল চালু হওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান সংকটের সমাধান পুরোপুরি নির্ভর করছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রতিটি উৎসে জ্বালানি সরবরাহ পুনরুদ্ধার এবং জাতীয় গ্রিডে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ফেরানোর ওপর।

মাত্র ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে ৩ হাজার ৬৭১ থেকে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে উঠে যাওয়া লোডশেডিংয়ের রেকর্ড তাই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর একসঙ্গে তৈরি হওয়া একাধিক চাপের প্রতিফলন। গভীর রাতেও যখন তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকে, তখন সংকটটি আর শুধু পিক আওয়ারের চাহিদা ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। গ্যাস সরবরাহ, কয়লা আমদানি ও মজুত, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি সক্ষমতা, আমদানি করা বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্যতা এবং বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা সবগুলোকে একই সঙ্গে স্থিতিশীল করার প্রয়োজনীয়তাই এখন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অন্যথায় তীব্র গরমের এই সময়ে লোডশেডিংয়ের নতুন রেকর্ড আরও ভাঙবে কি না, সেই আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়