ভাটিয়ারীতে জাহাজভাঙা কারখানায় গ্যাস বিস্ফোরণে নিহত বেড়ে ৮
ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী স্টেশন রোডসংলগ্ন সাগর উপকূলে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের ট্যাংক থেকে ভয়াবহ বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আটজন শ্রমিকের প্রাণহানির নিশ্চিত খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া গুরুতর আহত অবস্থায় আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পুরো ভাটিয়ারী এলাকজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল আনুমানিক নয়টার দিকে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার সাগর উপকূলের এই জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে কাজ চলাকালীন এই দুর্ঘটনা ঘটে। ইয়ার্ডটির মালিক মো. লোকমান হলেও এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ফেরদৌস ওয়াহিদ।
প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়, ইয়ার্ডে যে স্ক্র্যাপ জাহাজটি কাটা হচ্ছিল, সেটি মূলত একটি এলএনজি (তরল প্রাকৃতিক গ্যাস) বহনকারী জাহাজ ছিল। এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজগুলো নিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত (গ্যাস ফ্রি) করার পর কাটার নিয়ম থাকলেও, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও কারখানার পক্ষ থেকে যথাযথ নিরাপত্তা ও পূর্বপ্রস্তুতি না নিয়েই কাজ পরিচালনা করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
জাহাজটির একটি ট্যাংক থেকে হঠাৎ গ্যাস লিক হতে দেখে ইয়ার্ডের সেফটি টিম ও কিছু শ্রমিক সেটি পরীক্ষা করতে যান। ঠিক সেই মুহূর্তেই ট্যাংকে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিস্ফোরণ ঘটে।
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এলএনজি ট্যাংকে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড কিংবা কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো মারাত্মক প্রাণঘাতী গ্যাস অবরুদ্ধ ছিল। ট্যাংকের মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গেই সেই গ্যাস নির্গত হয়ে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
দুর্ঘটনার তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, কারখানার ভেতর থেকে নির্গত গ্যাসের উৎকট গন্ধে আশপাশের এলাকা ভারী হয়ে ওঠে।
স্থানীয় জেলেদের বরাতে জানা যায়, ঘটনার সময় সাগরে ইলিশ ধরতে যাওয়া জেলেরা গ্যাসের তীব্র গন্ধের কারণে কারখানাটির পাশের খালে প্রবেশ করতে পারেননি। বাধ্য হয়ে তারা অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে নৌকা ভেড়াতে বাধ্য হন।
হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে শ্রমিকদের আর্তচিৎকার ও বাঁচাও বাঁচাও রব শুনে স্থানীয় লোকজন ও আশপাশের মানুষ ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তারা দেখতে পান, কারখানার ভেতরে অসুস্থ ও অচেতন শ্রমিকদের দ্রুত গাড়িতে করে হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। পরবর্তীতে জাহাজের ভেতরে ও ইয়ার্ড চত্বরে শ্রমিকদের মরদেহ পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জনতা ও নিহতদের স্বজনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালান এবং ইয়ার্ডের বিভিন্ন মালামাল তছরুপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে বিষাক্ত গ্যাস লিকেজে ৫ শ্রমিকের মৃত্যু
খবর পেয়ে কুমিরা ফায়ার স্টেশনের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা কারখানার ভেতর থেকে প্রথমে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে গুরুতর আহত ও অচেতন অবস্থায় অন্য শ্রমিকদের উদ্ধার করে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়।
চমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালে আনার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা আরও বেশ কয়েকজনকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রথমে পাঁচজনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও পরবর্তীতে দফায় দফায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে আটজনে পৌঁছায়।
চমেক হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক ইশতিয়াক আহমেদ ও ইশতিয়াক রহমান জানান, বিষাক্ত গ্যাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করায় এবং বিস্ফোরণের তীব্র আঘাতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত আট শ্রমিকের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে। তারা হলেন ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা সানি জলদাস (২২), দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) এবং নাসির উদ্দিন (৩৮), পলাশ জলদাস (২৭)। মো. রানা (২৫), খোকন (২৬)। বাকি দুজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
নিহতদের মরদেহ বর্তমানে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
দুর্ঘটনায় আপন দুই ভাই মনসুর ও নাছিরের মর্মান্তিক মৃত্যুতে তাদের পরিবারে চলছে আহাজারি।
হাসপাতালে ছুটে আসা মনসুরের বোনজামাই মো. মহিউদ্দিন কান্নায় ভেঙে পড়ে গণমাধ্যমকে জানান, মাত্র কয়েক দিন আগেও কারখানার ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে শারীরিক কষ্ট হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন মনসুর। এমনকি তিনি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগেই ঘাতক বিস্ফোরণ তার প্রাণ কেড়ে নিল।
নিহত খোকনের চাচা এবং এই কারখানাটিরই সাবেক শ্রমিক আঙ্গুর আলী জানান, সকালে দুর্ঘটনার খবর পেয়েই তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং সেখানে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি দেখতে পান। বিস্ফোরণের পর শ্রমিকেরা কারখানার ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় অচেতন অবস্থায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিলেন। বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রতার কারণে প্রথম দিকে উদ্ধারকর্মীরাও সহজে ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি।
ঘটনার পর সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম দ্রুত ঘটনাস্থলে যান এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
তিনি গণমাধ্যমকে জানান, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় থানা পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ ও প্রশাসন ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নেয়।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম এবং চমেক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নুরুল আলম জানান, পুরো বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইয়ার্ডে শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও প্রটোকল মানা হচ্ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান জানিয়েছেন, জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের অবহেলা বা শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








