|| নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৮:৪০, ১৩ আগস্ট ২০২৬

৭ ঘণ্টায় উন্মোচন সিলেটে তিন খুনের রহস্য

৭ ঘণ্টায় উন্মোচন সিলেটে তিন খুনের রহস্য

ছবি: সংগৃহীত

সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় সংঘটিত চাঞ্চল্যকর ট্রিপল মার্ডার বা তিন খুনের রহস্য মাত্র সাত ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ঘাটন করেছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)। 

বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে রায়নগরের ১১১ নম্বর বাসার দোতলা থেকে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা মো. আব্দুস সাত্তার (৮২/৯০), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২/৭৬) ও তাদের গৃহপরিচারিকা তাহমিনা বেগমের (১৫/২৫) গলাকাটা মরদেহ উদ্ধারের পর পুরো সিলেট জুড়ে শোক ও আতঙ্কের ছায়া নেমে আসে। ঘটনার পরপরই পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে বিকেল ৫টার দিকে ঘাতক বাবুল মিয়াকে (২৬/৪০) আটক করতে সক্ষম হয়। পেশায় রংমিস্ত্রি বাবুল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন।

ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বুধবার সকাল ৯টার দিকে বাসার ভেতর থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ পাওয়া যায়, তবে অসুস্থ কেউ চিৎকার করছেন ভেবে প্রতিবেশীরা শুরুতে সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেননি। এর কিছুক্ষণ পর বাসার রঙের কাজের জন্য এক মিস্ত্রি এসে ডাকাডাকি করলেও কোনো সাড়া না পাওয়ায় সন্দেহ হয়। এর মধ্যে পাশের ভবনের এক ভাড়াটিয়া লক্ষ্য করেন যে, আব্দুস সাত্তারের বাসার দরজার নিচ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে বারান্দায় বের হয়ে আসছে। এই দৃশ্য দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দিলে বেলা ১০টার দিকে পুলিশ দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। সেখানে একটি কক্ষে সুরাইয়া বেগম ও তাহমিনার এবং অন্য কক্ষে আব্দুস সাত্তারের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

এসএমপি কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিক তদন্ত ও খুনি বাবুলের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হিসেবে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিছুদিন আগে বাবুল ওই বাসায় রঙের কাজ করতে গিয়ে তাহমিনার সঙ্গে পরিচিত হয় এবং তাকে অনৈতিক প্রস্তাব দেয়। বিষয়টি নিয়ে তাহমিনা তাকে গালিগালাজ ও কঠোর প্রতিবাদ জানায়। 

আরও পড়ুন: সিলেটে বাসা থেকে স্বামী-স্ত্রীসহ ৩ জনের মরদেহ উদ্ধার

এরই জের ধরে বুধবার সকালে বাবুল পুনরায় ওই বাসায় গিয়ে তাহমিনার সঙ্গে পুনরায় তর্কাতর্কিতে লিপ্ত হয় এবং ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে প্রথমে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। এসময় তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং সবশেষে বাসার ড্রয়িংরুমে থাকা আব্দুস সাত্তারকেও বাবুল একইভাবে গলা কেটে হত্যা করে।

হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর খুনি বাসার পেছনের বারান্দার দরজার ছিটকিনি আটকে দোতলা থেকে নিচে লাফ দিয়ে পালিয়ে যায়। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের সময় এলাকায় লোডশেডিং থাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো ছিল, যা ঘাতক পরিকল্পিতভাবেই কাজে লাগিয়েছিল। তবে পুলিশের চৌকস দল আরেকটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ উদ্ধার করে, যেখানে বাবুলকে ঘটনাস্থল থেকে বেশ নিশ্চিন্তে হেঁটে চলে যেতে দেখা যায়। সেই ফুটেজেই তার হাতে ক্ষত ও রক্ত লক্ষ্য করে পুলিশ তাকে শনাক্ত ও আটক করতে সক্ষম হয়। বিকেলে খুনে ব্যবহৃত ছুরিটিও উদ্ধার করেছে পুলিশ।

নিহত আব্দুস সাত্তার সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড শাখার উপদেষ্টা ছিলেন এবং সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তার চার সন্তানের মধ্যে দুজন যুক্তরাজ্যে ও দুজন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। বাসায় তিনি স্ত্রী ও গৃহকর্মীকে নিয়েই থাকতেন। এলাকার একজন সজ্জন ও প্রবীণ ব্যক্তি হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। প্রাথমিক অবস্থায় বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রব তছনছ অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় ডাকাতি বা পূর্বশত্রুতার বিষয়টি সামনে আসলেও, শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও অনৈতিক প্রস্তাবের জেরেই যে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তা পুলিশের তদন্তে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

ঘাতক বাবুল মিয়া মিতালী আবাসিক এলাকার পাশের একটি কলোনিতে বসবাস করতেন। পুলিশ জানিয়েছে, বাবুলকে আরও নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এলাকাবাসী অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্লুলেস এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন হওয়ায় পুলিশের প্রতি স্বস্তি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়