লঘুচাপে উত্তাল সাগর, ৪ বন্দরে ৩ নম্বর সংকেত
ফাইল ছবি
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত লঘুচাপটি আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া, ভারী বৃষ্টি এবং সাগর উত্তাল হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলেছে। একই সঙ্গে বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকালে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, লঘুচাপটির প্রভাবে দেশের উপকূলীয় এলাকায় দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। একই সময়ে বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও এর কাছাকাছি পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত লঘুচাপটি আরও শক্তিশালী হতে পারে। ফলে সমুদ্রবন্দর, উত্তর বঙ্গোপসাগর এবং তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় আবহাওয়ার বিরূপ পরিস্থিতি আরও কিছুটা বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সমুদ্রে অবস্থানরত নৌযানগুলোকে ঝুঁকি বিবেচনায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর নিয়মিত নজর রাখতে বলা হয়েছে। চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত জারির অর্থ হলো, বন্দরের ওপর দিয়ে ঝোড়ো আবহাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নৌযানগুলোকে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
সাগরের পরিস্থিতি বিবেচনায় কোস্টগার্ডও মাছ ধরার ট্রলারসহ সব ধরনের সমুদ্রগামী নৌযানকে আপাতত সমুদ্রে না যাওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে।
পাথরঘাটা কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের স্টাফ অফিসার (অপারেশন্স) লে. কমান্ডার জামিলুর রহমান বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে সংশ্লিষ্ট জেলে, ট্রলার ও নৌযান মালিক, ঘাট কমিটি এবং বোট মালিক সমিতিসহ সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে অবহিত করেন।
কোস্টগার্ডের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, বর্তমানে সমুদ্রে ঢেউয়ের উচ্চতা আনুমানিক ১২ থেকে ১৮ ফুটের মধ্যে ওঠানামা করছে। এর সঙ্গে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল থাকায় সমুদ্র অত্যন্ত উত্তাল ও বৈরী অবস্থায় রয়েছে।
আরও পড়ুন: ঢাকাসহ তিন বিভাগে বজ্রসহ বৃষ্টির শঙ্কা
কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরবর্তী নির্দেশনা এবং সমুদ্রে চলাচলের প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারেন্স না পাওয়া পর্যন্ত কোনো ট্রলার বা নৌযানকে মাছ ধরা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সমুদ্রে পাঠানো উচিত হবে না। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে সমুদ্রে যাওয়া হলে নৌযান দুর্ঘটনার পাশাপাশি প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটলে উত্তাল সমুদ্রে উদ্ধার অভিযান পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়ে এবং উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ে। কোস্টগার্ডের সতর্কবার্তায় আবহাওয়ার এ বিরূপ পরিস্থিতি আরও চার থেকে পাঁচ দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচ দিনের পূর্বাভাসেও দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত রয়েছে। বৃহস্পতিবার খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে শুধু উপকূলীয় এলাকা নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অঞ্চলও বৃষ্টির আওতায় থাকতে পারে।
বৃষ্টির প্রভাবে দেশের তাপমাত্রায়ও কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে; তবে রাতের তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমতে পারে। অর্থাৎ চলমান বৃষ্টিপাত ও মেঘলা আবহাওয়ার কারণে রাতের দিকে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনাযুক্ত এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা, নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় সাময়িক বিঘ্নের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায়ও দিনের প্রথমভাগে আংশিক মেঘলা থেকে অস্থায়ীভাবে মেঘলা আকাশ থাকতে পারে। এ সময় হালকা বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ অথবা দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। রাজধানীতে দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়া পরিস্থিতির এই পরিবর্তনের পেছনে বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপের পাশাপাশি সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাব রয়েছে। ফলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টির প্রবণতা তুলনামূলক বেশি থাকলেও এর প্রভাব দেশের অন্যান্য অঞ্চলও পেতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলের পাশাপাশি বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়া ও বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
এদিকে সাগরে মাছ ধরার মৌসুমে এমন বৈরী আবহাওয়া জেলেদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে ১২ থেকে ১৮ ফুট পর্যন্ত ঢেউয়ের উচ্চতা এবং ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে ছোট ও মাঝারি আকারের মাছ ধরার নৌযানগুলো বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ কারণে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কতা এবং কোস্টগার্ডের নির্দেশনা না মেনে নতুন করে কোনো নৌযান সমুদ্রে পাঠানো থেকে বিরত থাকার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপকে কেন্দ্র করে একদিকে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টি, অন্যদিকে উপকূলে ঝোড়ো হাওয়া ও উত্তাল সমুদ্র দুই ধরনের পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে। আবহাওয়ার এই বিরূপতা আগামী কয়েক দিন অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস থাকায় উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা, জেলে, ট্রলার মালিক এবং সমুদ্রগামী নৌযান সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সমুদ্রে থাকা নৌযানগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ের কাছাকাছি থাকা এবং পরবর্তী সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকায় আজ সূর্যাস্ত হবে সন্ধ্যা ৬টা ৩৪ মিনিটে এবং আগামীকাল শুক্রবার সূর্যোদয় হবে ভোর ৫টা ৩৩ মিনিটে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








