আজ আকাশে একই সাথে ‘ব্লু মুন’ ও বছরের সবচেয়ে দূরবর্তী ‘মাইক্রো মুন’
ছবি: সংগৃহীত
মহাকাশপ্রেমী ও জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুরাগীদের জন্য আজ রোববার এক অবিস্মরণীয় ও রোমাঞ্চকর রাত হতে যাচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাংলাদেশসহ এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইউরোপ ও আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছেন এক বিরল মহাজাগতিক ঘটনা ‘ব্লু মুন’।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, এটি কেবল একটি সাধারণ পূর্ণিমা নয়, বরং দীর্ঘ বিরতির পর আকাশে একসাথে ঘটতে যাওয়া দুটি বিরল ঘটনার অনন্য এক যুগলবন্দী। সর্বশেষ ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে বিশ্বের আকাশে এমন দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় তিন বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ ৩১ মে এই বিশেষ মহাজাগতিক রূপ দেখার সুযোগ এসেছে বিশ্ববাসীর সামনে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, আজকের এই সুযোগ হাতছাড়া হলে পরবর্তী ‘ব্লু মুন’ দেখার জন্য মহাকাশপ্রেমীদের ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এই মহাজাগতিক ঘটনার নামকরণের পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। ‘ব্লু মুন’ নামের মধ্যে ‘ব্লু’ বা নীল শব্দটির উপস্থিতি থাকলেও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর অর্থ এই নয় যে আজ আকাশে নীল রঙের চাঁদ উদিত হবে। চাঁদ মূলত তার স্বাভাবিক রূপালি-সাদা বা আকর্ষণীয় সোনালি আভা নিয়েই পূর্ব আকাশে আত্মপ্রকাশ করবে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিভাষায়, সাধারণত একটি ইংরেজি ক্যালেন্ডার মাসে যদি দুটি পূর্ণিমা সংঘটিত হয়, তবে সেই মাসের দ্বিতীয় পূর্ণিমার চাঁদটিকে ‘ব্লু মুন’ বলা হয়। চাঁদের নিজস্ব আবর্তনকাল বা সিনোডিক মাস প্রায় ২৯ দশমিক ৫ দিন হওয়ায় প্রতি দুই থেকে তিন বছর অন্তর (কিংবা ১৯ বছরে সর্বোচ্চ ৭ বার) ক্যালেন্ডারের হিসাব মেলাতে এমন জোড়া পূর্ণিমার সৃষ্টি হয়। ১৫০০ শতকের দিকে পশ্চিমা সমাজে ‘চাঁদ নীল’ হওয়ার প্রবাদটি মূলত কোনো অসম্ভব বা অত্যন্ত বিরল ঘটনা বোঝাতে ব্যবহৃত হতো, যা থেকে পরবর্তীতে এই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক নামকরণের উৎপত্তি ঘটে। তবে পৃথিবীর ইতিহাসে এর ব্যতিক্রমী নজিরও রয়েছে। ১৮৮৩ সালে ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির প্রলয়ঙ্করী অগ্ন্যুৎপাতের পর বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ ধূলিকণা ও সালফার ছড়িয়ে পড়ার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ সাময়িকভাবে সত্যি সত্যিই নীল রঙের চাঁদ দেখেছিল, যা ছিল সম্পূর্ণ একটি বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনা।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের আকাশে বিরল লাইরিড উল্কাবৃষ্টি ও নক্ষত্রের মহোৎসব
এবারের ৩১ মে-র ব্লু মুনের আরেকটি সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব এবং বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হলো, এটি একই সঙ্গে একটি ‘মাইক্রো মুন’। চাঁদ যখন তার ডিম্বাকার কক্ষপথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে করতে সবচেয়ে দূরবর্তী অবস্থান অর্থাৎ ‘অ্যাপোজি’র কাছাকাছি অবস্থান করে এবং সে সময়েই পূর্ণিমা ঘটে, তখন তাকে মাইক্রো মুন বলা হয়। আজকের এই বিশেষ পূর্ণিমায় চাঁদ পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লাখ ৬ হাজার ৯৩ কিলোমিটার (২,৫২,৩৩৪ মাইল) দূরে অবস্থান করছে, যা চাঁদের স্বাভাবিক গড় দূরত্বের (৩,৮৪,৪০০ কিলোমিটার) চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে, এটিই হতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ ২০২৬ সালের সবচেয়ে দূরবর্তী ও ছোট পূর্ণিমা। পৃথিবী থেকে দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ার কারণে সাধারণ পূর্ণিমার তুলনায় আজ চাঁদকে আকারে প্রায় ১০ শতাংশ ছোট দেখাবে। তবে এই সূক্ষ্ম চাক্ষুষ পার্থক্য খালি চোখে সাধারণ দর্শকের কাছে খুব একটা স্পষ্ট নাও হতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সময়ের ব্যবধানের কারণে এই পূর্ণিমা পর্যবেক্ষণের সুনির্দিষ্ট সময়সূচিতে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে ৩০ মে রাতে চাঁদটি সবচেয়ে পূর্ণ দেখা গেলেও, বাংলাদেশসহ এশিয়া মহাদেশ, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের আকাশে আজ ৩১ মে রোববার রাতেই চাঁদকে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও শতভাগ পূর্ণ অবস্থায় দেখা যাবে।
আবহাওয়াবিদ ও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই চমৎকার দৃশ্য উপভোগ করার জন্য কোনো বিশেষ দামি টেলিস্কোপ, চশমা বা যন্ত্রের প্রয়োজন নেই; খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে খালি চোখেই এটি সম্পূর্ণ নিরাপদে দেখা যাবে। বিশেষ করে আজ সন্ধ্যায় চাঁদ যখন দিগন্তের কাছাকাছি থাকবে (সন্ধ্যা ৫:৩০ থেকে ৬:৩০ এর মধ্যে), তখন পৃথিবীর ঘন বায়ুমণ্ডলীয় স্তরের আলোর প্রতিফলনের কারণে চাঁদকে চমৎকার ও মোহনীয় কমলা বা সোনালি আভায় দেখা যাবে। স্মার্টফোনে বা ক্যামেরায় চাঁদের সুন্দর ছবি তোলার জন্য এই সময়টি সবচেয়ে আদর্শ। পরবর্তীতে চাঁদ যত আকাশের ওপরে উঠবে, এটি তার স্বাভাবিক পরিচিত উজ্জ্বল স্নিগ্ধ সাদা রূপ ধারণ করবে।
এই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গুরুত্বের পাশাপাশি ঐতিহ্যগতভাবে এই পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ও জ্যোতিষশাস্ত্রীয় বিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে। বহু সংস্কৃতিতে এই বিশেষ পূর্ণিমাকে অত্যন্ত শক্তিশালী ও ইতিবাচক শক্তির উৎস বলে মনে করা হয়, যা মানুষের মানসিক পরিবর্তন, গভীর আত্মবিশ্লেষণ এবং জীবনে নতুন সূচনার প্রতীক। এই কারণে আজকের এই বিশেষ রাতে চাঁদের আলোয় কিছুক্ষণ হাঁটা, প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো কিংবা ধ্যান ও শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন করা মানসিক প্রশান্তির জন্য উপকারী বলে মনে করেন অনেকে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে, আকাশ যদি মেঘমুক্ত ও পরিষ্কার থাকে, তবে আজ রাতের আকাশে ব্লু মুন ও মাইক্রো মুনের এই বিরল মহাজাগতিক মিতালী সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে বিজ্ঞানী—সবার জন্যই এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








