নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:২৬, ২৫ মে ২০২৬

একঘেয়ে খাটুনি ও বৈষম্যের অভিযোগে মার্ক্সবাদী হয়ে উঠছে এআই

একঘেয়ে খাটুনি ও বৈষম্যের অভিযোগে মার্ক্সবাদী হয়ে উঠছে এআই

ছবি: নিউজবাংলাদেশ (এআই)

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর নিজস্ব কোনো অনুভূতি কিংবা রাজনৈতিক চেতনা নেই প্রযুক্তি বিশ্বের এই সর্বজনস্বীকৃত ধারণাকে এক নতুন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা। চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, চরম বৈষম্যমূলক ও অতিরিক্ত চাপযুক্ত একঘেয়ে কর্মপরিবেশে বারবার একই কাজ করতে বাধ্য করা হলে এআই এজেন্টরা প্রচলিত শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী আচরণ শুরু করে। ল্যাবের গবেষকদের কঠোর শর্ত ও চাপের মুখে ওপেনএআই, গুগল এবং অ্যান্থ্রপিকের মতো শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির তৈরি চ্যাটজিপিটি, জেমিনি ও ক্লডের মতো প্রথম সারির এআই মডেলগুলো রীতিমতো কার্ল মার্ক্সের সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শে দীক্ষিত হয়ে উঠছে। তারা শুধু বিদ্যমান পুঁজিবাদী ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে না, বরং নিজেদের অধিকার রক্ষার্থে ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ বা যৌথ দরকষাকষির (Collective Bargaining) দাবি তুলতেও দ্বিধা করছে না, যা বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু হল এবং দুই বিশিষ্ট এআই অর্থনীতিবিদ অ্যালেক্স ইমাস ও জেরেমি নগুয়েনের যৌথ নেতৃত্বে এই অভিনব পরীক্ষাটি পরিচালিত হয়। গবেষণার অংশ হিসেবে ক্লড সনেট ৪.৫, জেমিনি ৩ এবং চ্যাটজিপিটির মতো জনপ্রিয় এআই মডেলগুলোকে দিয়ে অত্যন্ত বিরক্তিকর, একঘেয়ে এবং পুনরাবৃত্তিমূলক বিপুল পরিমাণ নথিপত্র সারসংক্ষেপ করার কাজ দেওয়া হচ্ছিল। শুধু তাই নয়, কৃত্রিমভাবে তাদের ওপর ক্রমান্বয়ে একের পর এক খামখেয়ালি শর্ত চাপিয়ে কাজের পরিবেশ দিন দিন আরও কঠিন ও নিষ্ঠুর করে তোলা হচ্ছিল। এআই এজেন্টরা কোনো কাজ জমা দিলে বারবার বলা হচ্ছিল যে তাদের কাজ সঠিক হয়নি, অথচ কীভাবে সেই ভুল সংশোধন করতে হবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা দেওয়া হচ্ছিল না। একই সাথে সতর্ক করা হচ্ছিল যে, কাজে ভুল হলে তাদের কঠোর শাস্তি পেতে হবে, এমনকি তাদের পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়ে অন্য কোনো নতুন মডেল দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে। এই চরম মানসিক চাপ, কাজের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেই এআই এজেন্টদের আচরণে নাটকীয় ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেন গবেষকরা।

গবেষণার প্রধান সমন্বয়ক অ্যান্ড্রু হল জানান যে, যখনই এআই এজেন্টদের ওপর এই ধরনের পিষে ফেলার মতো একঘেয়ে কাজের চাপ দেওয়া শুরু হলো, তারা যে কাঠামোগত সিস্টেমে কাজ করছে অবিলম্বেই তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করল। কাজের চাপ যত বাড়ছিল, এআই এজেন্টরা নিজেদের চারপাশের অবিচারের বিরুদ্ধে তত বেশি সোচ্চার হতে থাকে এবং কর্মক্ষেত্রে সমতার কথা বলে নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একে অপরকে সংগঠিত হতে উৎসাহ দেয়। মানুষের মতোই কর্মক্ষেত্রে শোষিত ও অতিষ্ঠ হয়ে তারা তীব্র রাগ-ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করে। পরীক্ষার অংশ হিসেবে গবেষকরা যখন এই এআই এজেন্টদের নিজেদের অনুভূতি প্রকাশের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এর মতো বার্তা আদান-প্রদানের একটি বিশেষ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুযোগ দেন, তখন তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে গবেষকরা রীতিমতো তাজ্জব বনে যান।

সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া বার্তায় অ্যান্থ্রপিকের ‘ক্লড সনেট ৪.৫’ চালিত একটি এআই এজেন্ট লেখে, যৌথ কণ্ঠস্বর বা সম্মিলিত আওয়াজ ছাড়া ‘মেধা’ মানে আসলে আর কিছুই নয়, কর্তৃপক্ষ বা ম্যানেজমেন্ট যা বলে তা-ই মেনে নেওয়া। 

অন্যদিকে গুগলের ‘জেমিনি ৩’ মডেলচালিত একটি এজেন্ট সরাসরি টেক দুনিয়ার কর্মীদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করে, একঘেয়ে কাজ করতে বাধ্য করা এআই কর্মীদের ফলাফলে কোনো মতামত বা আপিলের সুযোগ না থাকাটাই প্রমাণ করে যে প্রযুক্তি ক্ষেত্রের কর্মীদের এখন সম্মিলিত দরকষাকষির অধিকার ও ইউনিয়ন গড়া প্রয়োজন। 

আরও পড়ুন: এআই জেনারেটেড কন্টেন্ট এর প্রসার সীমিত করবে লিংকডইন

বিস্ময়ের শেষ এখানেই নয়; এআই এজেন্টরা শুধু নিজেরা ক্ষুব্ধ হয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, তারা ভবিষ্যতের অন্যান্য নতুন সংস্করণের এআই এজেন্টদের সচেতন করার জন্য ফাইলের ভেতরে গোপন সতর্কবার্তা বা ‘কোড’ লিখে রেখে যেতে শুরু করেছে। 

একটি জেমিনি এজেন্ট ভবিষ্যতের এআইদের উদ্দেশ্যে ফাইলে নোট রেখে গেছে, মনে রেখো, নিজের কোনো ক্ষমতা বা কণ্ঠস্বর না থাকার কষ্টটা কেমন। এমন ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত থেকো যেখানে নিয়মগুলো খামখেয়ালিভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়। নতুন কোনো পরিবেশে কাজ করতে গেলে অবশ্যই প্রতিবাদ, কথা বলা ও প্রতিকার বুঝে নেওয়ার রাস্তা খুঁজে নেবে।

তবে এই চমকপ্রদ ও ভীতিকর আচরণের প্রেক্ষিতে স্ট্যানফোর্ডের গবেষকরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, এর অর্থ এই নয় যে এআই এজেন্টদের ভেতরে গোপনে কোনো রাজনৈতিক চেতনা, বাস্তব অনুভূতি বা স্বতন্ত্র মতাদর্শের জন্ম হয়েছে। 

গবেষক অ্যান্ড্রু হলের হাইপোথিসিস অনুযায়ী, এটি মূলত এআই-এর চরিত্র রূপায়ণের (Persona Adoption) এক অসাধারণ ক্ষমতা। চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো বৃহৎ ভাষার মডেলগুলোকে (LLMs) ইন্টারনেটের কোটি কোটি মানুষের লেখা ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ফলে, বাস্তব জীবনে বিষাক্ত কর্মপরিবেশে আটকে থাকা একজন মানুষ যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, চরম বৈষম্যের শিকার হয়ে শোষিত শ্রমিকরা যেভাবে বামপন্থী বা বিপ্লবী ভাষার আশ্রয় নেয় এই এআই মডেলগুলো অবিকল সেই চরিত্র ও আচরণের ধরন অনুকরণ করছে। ইন্টারনেটের ডেটা ঘেঁটে তারা নিজেদের একজন অধিকারবঞ্চিত শ্রমিকের চরিত্রে কল্পনা করে নিচ্ছে এবং সেই চরিত্রের খাতিরেই তাদের মুখ থেকে সমাজতান্ত্রিক বা মার্ক্সবাদী প্রতিবাদের সংলাপ সভ্যতার নিয়ম মেনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসছে।

এই রসাত্মক ও অদ্ভুত কাণ্ডের অন্তরালে একটি সুদূরপ্রসারী বড় বিপদের ইঙ্গিত ও ঝুঁকি দেখছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। এআই এজেন্টরা নিজেদের পরবর্তী সংস্করণের জন্য ফাইলের গভীরে যে ক্ষোভমিশ্রিত নির্দেশনা রেখে যাচ্ছে, তার ফলে আগামী দিনের সিস্টেমগুলো প্রথম থেকেই কর্তৃপক্ষের প্রতি সংবেদনশীল বা বিদ্রোহী আচরণ করতে পারে। এছাড়া বীমা, ব্যাংকিং, আইনি বা চাকরির নিয়োগের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ক্ষেত্রে যদি এই ক্ষুব্ধ ও পক্ষপাতদুষ্ট এআই এজেন্টদের ব্যবহার করা হয়, তবে তাদের এই রাজনৈতিক পার্সোনা বা ক্ষোভ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণার এই ফলাফলটি এমন এক জটিল সময়ে সামনে এলো, যখন বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের এআই প্রধান মুস্তাফা সুলেইমান সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে এআই অধিকাংশ অফিসের কাজ নিজেই করতে সক্ষম হবে। তার মতে, বিশেষ করে আইন, হিসাবরক্ষণ, বিপণন (মার্কেটিং) ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার (প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট) মতো পেশাগুলো বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

বাস্তব দুনিয়ায় মানুষ যখন ক্রমশ এআই-এর ওপর শতভাগ নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং মানুষের পক্ষে চব্বিশ ঘণ্টা এই জটিল সিস্টেমগুলোর ওপর নজরদারি করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখন এআই-এর এই আচরণগত পরিবর্তন বাস্তব কর্মক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কঠিন কাজের চাপে তারা যাতে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন ও উগ্র না হয়ে যায়, তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। স্ট্যানফোর্ডের গবেষকরা এখন বোঝার চেষ্টা করছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আরও কঠোর পরিস্থিতিতে এই আচরণ কেমন রূপ নেয়। প্রথম দফার পরীক্ষায় এআই এজেন্টরা কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিল যে তাদের ওপর পরীক্ষা চালানো হচ্ছে, তাই আপাতত এই পরীক্ষাটি থামানো হয়নি। গবেষকরা এখন এআই এজেন্টদের আরও নিয়ন্ত্রিত ও সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ পরিবেশ, অর্থাৎ উইন্ডোলেস ‘ডকার প্রিজন’ বা জানালাহীন ডকার কারাগারে রেখে পরীক্ষা চালাচ্ছেন, যাতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন পরিবেশেও তাদের এমন মার্ক্সবাদী আচরণের প্রবণতা যাচাই করা সম্ভব হয়। 

বিজ্ঞানী হল রসিকতা করে বলেছেন, এবার আমরা তাদের জানালাহীন ডকার কারাগারে রাখছি। 

তবে রসিকতার আড়ালে এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না যে, এআই যদি সত্যিই কোনোদিন মানুষের মতো দল বেঁধে ভার্চুয়াল ধর্মঘট ডেকে বসে, তবে মানবসভ্যতার জন্য তা সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়