স্পোর্টস ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:৫৪, ৯ জুন ২০২৬
আপডেট: ২০:৫৫, ৯ জুন ২০২৬

২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়াকে হারালো বাংলাদেশ

২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়াকে হারালো বাংলাদেশ

ছবি: সংগৃহীত

কার্ডিফের সেই ঐতিহাসিক ২০০৫ সালের পর কেটে গেছে সুদীর্ঘ ২১টি বছর। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ওয়ানডে ক্রিকেটে পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটি জয়ের জন্য হাহাকার ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে। অবশেষে মিরপুরের শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ঘুচল সেই দীর্ঘদিনের আক্ষেপ। 

তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে বৃষ্টি ও বজ্রপাতের বাধায় ডিএলএস (ডকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন) মেথডে অস্ট্রেলিয়াকে ৮৬ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। সাড়ে তিন বছর পর জাতীয় দলে ফিরে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের ক্যারিয়ারসেরা অলরাউন্ড পারফরম্যান্স এবং গতিদানব নাহিদ রানার বিধ্বংসী বোলিংয়ের ওপর ভর করে অজিদের বিপক্ষে ওয়ানডে সংস্করণে নিজেদের ইতিহাসের দ্বিতীয় জয়টি তুলে নিল মেহেদী হাসান মিরাজের দল। এই জয়ের ফলে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

মঙ্গলবার (০৯ জুন) সকালে মিরপুরে টস জিতে বাংলাদেশকে প্রথমে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানান অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক ও উইকেটরক্ষক জশ ইংলিশ। 

ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় স্বাগতিকরা; ওপেনার সাইফ হাসান মাত্র ৫ রান করে সাজঘরে ফেরেন। তবে দ্বিতীয় উইকেটে দলের হাল ধরেন আরেক ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্ত। এই জুটি স্কোরবোর্ডে মূল্যবান ৯৭ রান যোগ করে ভিত শক্ত করেন। তানজিদ তামিম ৪৪ বলে ৭টি চার ও ১টি ছক্কার সাহায্যে ৫৪ রানের একটি ঝড়ো ইনিংস খেলেন। অন্যদিকে, ২৪ রানে জীবন পাওয়া শান্ত খেলেন ৬৭ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস। ৮৬ বলের এই ইনিংসে তিনি ৯টি চার ও ১টি ছক্কা হাঁকান। মাঝে লিটন দাস (৭) ও তাওহীদ হৃদয় (৫১ বলে ৩১) কিছুটা সংগ্রাম করলে বাংলাদেশের রানের গতি মন্থর হয়ে পড়ে। অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজও (৩) আজ সুবিধা করতে পারেননি।

এক প্রান্ত যখন নিয়মিত উইকেট পড়ছিল, তখন অন্য প্রান্তে দৃশ্যপটের কেন্দ্রীয় চরিত্রে আবির্ভূত হন সাড়ে তিন বছর পর দলে ফেরা মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। দলের বিপর্যয়ে আগ্রাসী ও কার্যকারী ব্যাটিংয়ে রানের চাকা সচল রাখেন তিনি। শেষ দিকে তাকে যোগ্য সংগত দেন পেসার তাসকিন আহমেদ, যিনি ১৫ বলে ২০ রানের একটি ক্যামিও ইনিংস খেলেন। নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৮৪ রানের চ্যালেঞ্জিং পুঁজি দাঁড় করায় বাংলাদেশ। মোসাদ্দেক ৭০ বলে ৭টি চার ও ৩টি ছক্কার সাহায্যে ৮৬ রান করে অপরাজিত থাকেন, যা ওয়ানডে ক্রিকেটে তার ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে পেসার নাথান এলিস ১০ ওভারে ১টি মেডেনসহ ৩৮ রান খরচায় ৩টি উইকেট শিকার করেন।

আরও পড়ুন: বৃষ্টির হানায় মিরপুরে নিশ্চিত জয়ের অপেক্ষা বাড়ল বাংলাদেশের

২৮৫ রানের বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইনিংসের প্রথম বলেই চরম বিপর্যয়ে পড়ে সফরকারী দল। পেসার তাসকিন আহমেদের দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে কোনো রান করার আগেই বোল্ড হয়ে যান অজি ওপেনার ম্যাথু শর্ট। পরের ওভারেই আঘাত হানেন কাটার মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমান। মারনাস লাবুশেনকে (১) এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন তিনি; আম্পায়ার প্রথমে সাড়া না দিলেও বাংলাদেশ রিভিউ নিয়ে সফল হয়। মাত্র ২ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে টেনে তোলার চেষ্টা করেন অধিনায়ক জশ ইংলিশ ও কুপার কনোলি। তবে আক্রমণে এসেই নিজের গতির আগুনে এই জুটি ভাঙেন নাহিদ রানা। ১১তম ওভারের প্রথম বলে ঘণ্টায় ১৪৭.৯ কিলোমিটার গতির এক ডেলিভারিতে ইংলিশকে (১৯) উইকেটরক্ষক লিটনের ক্যাচে পরিণত করেন রানা। আউট করার পর রানার আগ্রাসী মন্তব্যে মাঠে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হলেও মিরাজের হস্তক্ষেপে তা বড় আকার ধারণ করেনি।

৫১ রানে ৩ উইকেট পতনের পর চতুর্থ উইকেটে অ্যালেক্স ক্যারি ও কুপার কনোলি ৫৫ বলে ৪৪ রানের প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কিন্তু এই জুটিও বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেননি বল হাতে আক্রমণে আসা মোসাদ্দেক হোসেন। ২০তম ওভারের চতুর্থ বলে থিতু হওয়া কনোলিকে (৩৫) বোল্ড করে ব্রেকথ্রু এনে দেন তিনি। এরপর শুরু হয় নাহিদ রানার গতির তান্ডব। উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ব্যক্তিগত ৪৭ রানে ফেরেন লড়াকু ক্যারি। অভিষিক্ত লিয়াম স্কটকে (২) ১৪৬ কিলোমিটার গতির বাউন্সারে গালিতে তাওহীদ হৃদয়ের ক্যাচ বানান রানা। এরপর হ্যাভিয়ের বার্টলেটকেও (১) ১৪৮.৫ কিলোমিটার গতির বিধ্বংসী বাউন্সারে পরাস্ত করেন এই তরুণ পেসার। মাঝে ম্যাট রেনশকে (২) এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন মোসাদ্দেক। আর নাথান এলিসকে (৮) মোস্তাফিজুর রহমানের ক্যাচে পরিণত করতে মিড-অফ থেকে সীমানার দিকে দৌড়ে গিয়ে কাঁধের ওপর দিয়ে এক অসাধারণ ক্যাচ নেন ফিল্ডিংয়েও উজ্জ্বল থাকা মোসাদ্দেক।

১৫৬ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়া যখন ম্যাচ থেকে সম্পূর্ণ ছিটকে গেছে, তখন শেষ উইকেটে হারের ব্যবধান কমাতে থাকেন ক্যামেরন গ্রিন ও অ্যাডাম জাম্পা। অজি ব্যাটারদের আসা-যাওয়ার মিছিলে এক প্রান্ত ধরে রেখে গ্রিন ৬৪ বলে নিজের হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেন। দুই ব্যাটার ৩৪ বলে ৩৫ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ার পর ৪২.২ ওভারে (সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিটে) তীব্র বজ্রপাত ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ তখন ৯ উইকেটে ১৯১ রান। বাংলাদেশের তখন জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল মাত্র ১ উইকেট। তবে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও প্রকৃতির বাধা দূর না হওয়ায় এবং শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি নামায় আম্পায়াররা ডিএলএস মেথডে বাংলাদেশকে ৮৬ রানে বিজয়ী ঘোষণা করেন। ক্যামেরন গ্রিন ৫২ রানে এবং অ্যাডাম জাম্পা ব্যক্তিগত ১ রানে অপরাজিত থাকেন।

বাংলাদেশের পক্ষে পেসার নাহিদ রানা ওয়ানডে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪টি উইকেট (৮ ওভারে ৪০ রান) শিকারের কৃতিত্ব দেখান। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ যখন প্রথম অজিদের হারিয়েছিল, তখন রানার বয়স ছিল মাত্র ৩ বছর। এছাড়া মোস্তাফিজুর রহমান ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত ২টি করে উইকেট নেন।

মিচেল মার্শ, ট্রাভিস হেড কিংবা প্যাট কামিন্সের মতো তারকাদের ছাড়া বাংলাদেশে আসা এই তুলনামূলক খর্বশক্তির অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ম্যাচেই নাস্তানাবুদ করল টাইগাররা। আগামী পরশু মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামেই সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে মুখোমুখি হবে এই দুই দল এবং আগামী ১৪ জুন অনুষ্ঠিত হবে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডে ম্যাচ।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়